জামায়াত-এনসিপিসহ চার দলকে সতর্কতা ইসির
জামায়াত আমিরসহ আট নেতাকে নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ
আজ প্রতীক বরাদ্দ, কাল থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে প্রায় অর্ধশত আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ও বহিষ্কারের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে এসব প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এখনো পর্যন্ত প্রায় ৫০টি আসনে ৯১ জন বিদ্রোহী প্রার্থী সক্রিয় আছেন। দলীয় টিকিট না পেয়ে অনেক সাবেক ও বর্তমান স্থানীয় নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এর ফলে স্থানীয় ইউনিটগুলোতে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত বৈধ রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে আজ প্রতীক বরাদ্দ করবেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসাররা। প্রতীক নিয়ে প্রচারণা শুরু করতে পারবেন প্রার্থীরা।
এদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) চারটি দলকে সতর্ক করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল মঙ্গলবার দলগুলোর প্রধানের কাছে পাঠানো ইসির চিঠি থেকে বিষয়টি জানা গেছে। একইসঙ্গে বিএনপি মনোনীত এক প্রার্থী এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায়ের সাত নেতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের নতুন উদ্যোগ (পোস্টাল ব্যালট) নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানান অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে ১২টা বাজিয়ে দিতো। এই পরিস্থিতিতে আপনারা (সাংবাদিকরা) পাশে আছেন বলেই মানুষ সঠিক তথ্য পাচ্ছে। সাংবাদিকরা না থাকলে আমরা এতদূর আসতে পারতাম না।
গতকাল মঙ্গলবার ছিল সারা দেশে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষদিন। এইদিনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র অসংখ্য প্রার্থী প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সম্মানে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার এম সরওয়ার হোসেন। ঢাকার ২০টি সংসদীয় আসনে ২৫ জন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। ৫০টির মতো সংসদীয় আসনে ৯১ জনের মতো বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থিতা নির্বাচনে মাঠে রয়েছেন। শেষদিনে তারা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। তবে জোটের আসন ভাগাভাগির চুক্তির আওতায় যেসব আসন মিত্র দলগুলোকে দেওয়া হয়েছে, সেসব আসনের অন্তত ছয়টিতে এখনো বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে আছেন। ২৯২টি আসনে এবার ধানের শীষে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রার্থিতা দেয় বিএনপি। জোটসঙ্গীরা আটটি আসনে নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করছেন।
তবে বিএনপির তিন জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। ফলে এখনো পর্যন্ত ২৮৯টি আসনে ধানের শীষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার তথ্য পাওয়া গেছে। বহিষ্কৃত নেতা যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নীরব এখনো ঢাকা-১২ আসনে নির্বাচন করছেন। ঐ আসনে বিএনপি কোনো প্রার্থী দেয়নি। সেখানে জোটসঙ্গী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক প্রার্থী। ঢাকা-৭ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইশহাক সরকার। ঝিনাইদ-৪ আসনে স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ স্বতন্ত্র নির্বাচন করবেন। ঐ আসন থেকে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন গণঅধিকার পরিষদের রাশেদ খান।
সাতক্ষীরা-৩ আসন থেকে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী সদস্য ডা. মো. শহিদুল ইসলাম। ঐ আসন থেকে বিএনপির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক সংসদ সদস্য কাজী আলাউদ্দিন। পটুয়াখালী-৩ আসনে জোট চুক্তি অনুযায়ী বিএনপি কোনো প্রার্থী দেয়নি। সেখানে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক প্রার্থী। তবুও বিএনপি বিদ্রোহী হাসান মামুন প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে আছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রুমিন ফারহানা। ঐ আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহ-সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে। মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা কামরুজ্জামান রতন দলীয় প্রার্থী। একই আসনে জেলা বিএনপির সদস্য-সচিব মোহাম্মদ মহিউদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন।
মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন শেখ মো. আব্দুল্লাহ। তবে সেখানে জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোমিন আলী প্রার্থী হয়েছেন। কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মীর শরাফত আলীও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১৪ ও ১৬, সিলেট-৫, নাটোর-১, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ময়মনসিংহ-১, ৩, ৬, ৭, ৯, ১০ ও ১১ আসনেও তারা মাঠে আছেন। জয়পুরহাট-২, মাদারীপুর-১, হবিগঞ্জ-১, নারায়ণগঞ্জ-২, ৩ ও ৪ আসনেও বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। গোপালগঞ্জ-২, বাগেরহাট-২, ঝালকাঠি-১, চাঁদপুর-২, টাঙ্গাইল-১ ও ২ আসনেও একই চিত্র। দলীয় প্রার্থী বা সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করায় অন্তত বেশ কয়েক জন নেতাকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। তবে তাদের অধিকাংশ এখনো নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি।
এদিকে বিএনপির তিন জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। ফলে ঐ আসনগুলোতে দলটির আর কোনো বিকল্প প্রার্থী নেই। এটি নির্বাচনি প্রস্তুতিতে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীরা আপিল ও রিট আবেদন করেছেন। তারা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। নেতাদের আশঙ্কা, রায় পক্ষে না এলে কিছু অঞ্চলে বিএনপির নির্বাচনি অবস্থান আরো দুর্বল হবে। বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী ২২০টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। ইসলামী আন্দোলন এককভাবে ২৬৮, জাতীয় পার্টি ১৯৬, এনসিপি ৩০, খেলাফত মজলিস ২৯ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বলে জানা গেছে।
চার দলকে সতর্ক করল ইসি :বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) চারটি দলকে সতর্ক করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল মঙ্গলবার দলগুলোর প্রধানের কাছে ইসি থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বিএনপির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতের আমির, খেলাফত মজলিসের আমির, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির, এনসিপির আহ্বায়ককে সতর্ক করে চিঠিটি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর এরূপ অভিযোগ দায়ের করা হয় যে, ২১ জানুয়ারির আগে নির্বাচনি প্রচারণা নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নির্বাচনি প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে, যা রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫ এর বিধি ১৮ এর পরিপন্থি। নির্বাচন কমিশন অভিযোগ পর্যালোচনা করে নির্ধারিত সময়ের আগে নির্বাচনি প্রচারণা থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের দলীয় প্রধান ও দলের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দিয়েছে।
আট জনকে নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ :জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে বিএনপি মনোনীত এক প্রার্থী এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায়ের সাত নেতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে ইসি। ইসির নির্বাচন পরিচালনা-২ অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি চিঠিতে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইসির চিঠিতে জানানো হয়, গাজীপুর-১ সংসদীয় আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী মো. মজিবুর রহমান তার জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর আবেদন করেছিলেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণের দিন পর্যন্ত তার জন্য উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে। অপর এক চিঠিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দলের সাত জন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সংসদ সদস্য প্রার্থীর নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেন। ঐ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদেরও উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। জামাতের নেতারা হলেন জামায়াতে ইসলামী আমির ডা. শফিকুর রহমান, নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের (সাবেক এমপি), নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার (সাবেক এমপি), নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান (সাবেক এমপি), সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ (সাবেক এমপি) ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান।
সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচার নিয়ে ক্ষোভ :নির্বাচন কমিশনের নতুন উদ্যোগ (পোস্টাল ব্যালট) নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানান অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে আপনারা (সাংবাদিকরা) পাশে আছেন বলেই মানুষ সঠিক তথ্য পাচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের অডিটরিয়ামে রাজনৈতিক দলগুলোকে পোস্টাল ভোটিং সিস্টেম নিয়ে বিফ্রিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি। সিইসি বলেন, যে কোনো নতুন উদ্যোগে কিছু ভুলত্রুটি হতে পারে।
তিনি বলেন, ১২২টা দেশ থেকে প্রবাসীরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। এখানে ১২২ রকমের কালচার, পোস্টাল ডিপার্টমেন্টের ১২২ রকমের আইন-কানুন। আমাদের দেশে পোস্টাল সিস্টেম একরকম, অন্য দেশগুলোতে আবার ভিন্ন। এগুলোর মধ্যে পার্থক্য দূর করা বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আমাদের টিম কাজ করে যাচ্ছে।






