‘অপ্রিয়’ মেসি থেকে আর্জেন্টিনার ‘দেবতা’, বদলে যাওয়ার সেই গল্প

আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে লিওনেল মেসির শেষ কথাগুলো যেন ফিরিয়ে নিয়ে যায় এক দশক আগের সেই সময়ে। তখন একের পর এক ফাইনালে ব্যর্থতা, ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা আর তীব্র সমালোচনায় নিজের দেশেই কঠিন সময় পার করছিলেন তিনি। অথচ সেই মেসিই আজ আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে হয়ে উঠেছেন ‘দেবতা’। এখন মেসি মানেই ভালোবাসার আরেক নাম।

আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের ঘোষণা দিয়ে মেসি বলেছেন, জাতীয় দলের হয়ে তিনি নিজের সবটুকু দিয়েছেন। এখন আর দেওয়ার মতো কিছু নেই।

৩৯ বছর বয়সী মেসি ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জিতিয়েছিলেন। জাতীয় দলের হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল করে তিনি দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলার।

এক বিবৃতিতে মেসি বলেন, জাতীয় দলের অংশ হতে তিনি ভালোবেসেছেন, ভালোবাসেন এবং সবসময় ভালোবেসে যাবেন।

তিনি বলেন, “সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। জীবনের একেকটি অধ্যায় শেষ হয়, আর এই অধ্যায়টি শেষ করার সিদ্ধান্ত আমাকে গভীরভাবে কষ্ট দিচ্ছে।”

২০১৬ সালের ২৬ জুন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস করেন মেসি। ম্যাচ হারের পর জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি।

তখন মেসির বয়স মাত্র ২৯ বছর। এর আগেও ২০০৭ ও ২০১৫ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনাল এবং ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের কষ্ট পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। একের পর এক শিরোপা হাতছাড়া হওয়ার সেই ধারাবাহিকতার শেষ ধাক্কা ছিল ২০১৬ সালের হার।

জাতীয় দলের হয়ে ১১৩ ম্যাচ খেলার পর নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন মেসি। চোখের পানি সামলাতে সামলাতে তিনি বলেছিলেন, “আমার জন্য জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ। আমি যতটুকু পারি, সব করেছি। চ্যাম্পিয়ন হতে না পারার কষ্টটা খুব বেশি। এটিই ছিল আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া, কিন্তু আমি তা অর্জন করতে পারিনি।”

তবে সেই অবসর স্থায়ী হয়নি। দেশজুড়ে মেসিকে ফেরানোর দাবি ওঠে। পরে নিজের সিদ্ধান্ত বদলে আবারও আর্জেন্টিনার জার্সিতে ফেরেন তিনি।

মেসির স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো খুব কাছ থেকে দেখেছেন সেই কঠিন সময়। তিনি বলেছিলেন, বছরের পর বছর মেসিকে কষ্ট পেতে, হোঁচট খেতে এবং আবার উঠে দাঁড়াতে দেখেছেন। স্বপ্ন পূরণ না হলেও চেষ্টা থামাননি মেসি।

রোজারিওর সেই ছেলেটি

আর্জেন্টিনার তৃতীয় বৃহত্তম শহর রোজারিওতে জন্ম মেসির। ছোটবেলাতেই তার ফুটবল প্রতিভা নজর কাড়ে।

মাত্র ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনার এক স্কাউট তাকে স্পেনে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। মেসির চিকিৎসার জন্য তখন গ্রোথ হরমোন থেরাপির প্রয়োজন ছিল। এর খরচ বহন করা পরিবারের পক্ষে কঠিন ছিল। পরে বার্সেলোনা সেই খরচ বহনের সিদ্ধান্ত নেয়।

২০০১ সালে আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই মেসির জীবনে আসে বড় পরিবর্তন। বাবা তাকে নিয়ে চলে যান স্পেনে। মা ও তিন ভাইবোন থেকে যান রোজারিওতে।

বিদেশে বেড়ে ওঠা এবং বার্সেলোনায় একের পর এক সাফল্য পাওয়ার পরও আর্জেন্টিনার হয়ে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন ছাড়েননি মেসি। তবে ক্লাব ফুটবলে সাফল্য এলেও জাতীয় দলের হয়ে ব্যর্থতা বারবার তার পথ আটকে দেয়। এর সঙ্গে যোগ হয় তীব্র সমালোচনা।

ম্যারাডোনার ছায়া

মেসিকে ঘিরে সমালোচনার কেন্দ্রে বারবার এসেছে দিয়েগো ম্যারাডোনার নাম।

২০১৬ সালে মেসির প্রথম অবসরের কিছুদিন আগে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, মেসি খুব ভালো মানুষ হলেও তার ব্যক্তিত্ব নেই এবং নেতা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চরিত্রের ঘাটতি রয়েছে।

অথচ তখনও ৩০ বছর বয়স পার করেননি মেসি। এরই মধ্যে বার্সেলোনার হয়ে জিতে ফেলেছিলেন আটটি লা লিগা, চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং পাঁচটি ব্যালন ডি’অর।

আর্জেন্টিনার হয়ে তখন তার বড় অর্জন বলতে ছিল শুধু ২০০৮ সালের অলিম্পিক স্বর্ণপদক। অন্যদিকে ম্যারাডোনা ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন। ফলে মেসির প্রতিটি ব্যর্থতার পর দুই তারকার তুলনা আরও তীব্র হয়ে উঠত।

এই সময় আর্জেন্টিনায় মেসিকে ‘পেচো ফ্রিও’ নামে ডাকা হতো। স্প্যানিশ এই শব্দের অর্থ ‘ঠান্ডা বুক’। অপমানসূচক এই মন্তব্যের মাধ্যমে বোঝানো হতো, চাপের মুহূর্তে মেসির মধ্যে প্রয়োজনীয় আবেগ বা লড়াইয়ের মানসিকতা নেই।

কিন্তু মেসির জীবনী লেখক ও স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ গিয়েম বালাগের ভাষায়, হারলে মেসি ভেতরে ভেতরে গভীরভাবে ভেঙে পড়তেন। অধিনায়কত্বের চাপ এবং ম্যারাডোনার সঙ্গে ক্রমাগত তুলনা তাকে মানসিকভাবে প্রচণ্ড চাপে ফেলেছিল।

মেসি নিজেও পরে বলেছিলেন, আর্জেন্টিনায় তার পরিস্থিতি ছিল বার্সেলোনার সম্পূর্ণ বিপরীত।

তিনি বলেন, “কেন কিছু আর্জেন্টাইন আমাকে চাইত না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলিনি। তবে দেখতাম, বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাকে আক্রমণ করা হচ্ছে। যেন আমি দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত বাস্তবতায় বাস করছি। বার্সেলোনায় আমি নিয়মিত জিতছি, সবার সমর্থন, ভালোবাসা ও সম্মান পাচ্ছি। অথচ আর্জেন্টিনায় পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, চারদিকে শুধু সমালোচনা।”

তবু নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যাননি মেসি। তার বিশ্বাস ছিল, পরিশ্রম, ত্যাগ, কঠোর চেষ্টা এবং বিনয় থাকলে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।

ফেরা এবং অবশেষে পূর্ণতা

২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর এদগার্দো বাউজা আর্জেন্টিনার কোচের দায়িত্ব নেন। জেরার্দো মার্তিনোর স্থলাভিষিক্ত হয়ে মাত্র আট মাস দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

দায়িত্ব নেওয়ার পরই বাউজা বার্সেলোনায় গিয়ে মেসির সঙ্গে দেখা করেন এবং তাকে সিদ্ধান্ত বদলাতে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত মেসি জাতীয় দলে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।

ফেরার সময় মেসি বলেছিলেন, “আমি এই দেশ আর এই জার্সিকে অনেক বেশি ভালোবাসি। যারা আমাকে খেলা চালিয়ে যেতে চেয়েছেন, তাদের সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আশা করি খুব শিগগির তাদের আনন্দ করার মতো কিছু দিতে পারব।”

তবে ফেরার পরও সাফল্য সহজে আসেনি। ২০১৮ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। তখন অনেকেরই মনে হয়েছিল, মেসির পক্ষে আর কখনো বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব হবে না।

২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেক হওয়া মেসিকে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় শিরোপার জন্য অপেক্ষা করতে হয় ৩৪ বছর বয়স পর্যন্ত। অবশেষে ২০২১ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটায় আর্জেন্টিনা।

এরপরের তিন বছরেরও কম সময়ে মেসির নেতৃত্বে দলটি জিতে নেয় চারটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা। এর মধ্যে ছিল ওয়েম্বলিতে ফিনালিসিমা এবং সবচেয়ে বড় অর্জন ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ।

পরিবারের সামনেই একসময়ের অধরা স্বপ্ন পূরণ করেন মেসি। প্রতিটি শিরোপার পরই তার আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু প্রতিবারই তিনি খেলা চালিয়ে গেছেন।

শেষ পর্যন্ত ২০২৬ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামেন মেসি। সেটি ছিল তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ।

বয়স তখন ৩৯। আগের মতো গতি না থাকলেও কার্যকারিতা কমেনি। আটটি গোল ও চারটি অ্যাসিস্ট নিয়ে তার নেতৃত্বে ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছায় আর্জেন্টিনা।

শেষ ম্যাচে স্পেনের কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয়। আর সেই ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় সেই একই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে, যেখানে এক দশক আগে মেসি প্রথমবার জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

সমালোচনা থেকে ভালোবাসা

একসময় নিজের দেশেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়া মেসি পরে সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেছেন, আর্জেন্টিনায় সমালোচকেরা খেলোয়াড়দের একটি প্রজন্মের প্রতি অন্যায় আচরণ করেছিলেন।

ডিজনি স্টার প্লাসের ‘চ্যাম্পিয়নস, আ ইয়ার লেটার’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। আর্জেন্টিনায় সমালোচকেরা খেলোয়াড়দের একটি প্রজন্মের প্রতি খুবই অন্যায় আচরণ করেছে। আমাকে নিয়ে অনেক খারাপ কথাও বলা হয়েছে। আমি প্রতিহিংসাপরায়ণ নই, কিন্তু এত কিছুর পর কষ্ট না পাওয়াটা অসম্ভব।”

বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকা জয়ের পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে বলেও মনে করেন মেসি।

তিনি বলেন, “এখন আমি দেখি অনেক মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে গেছে। এই পরিবর্তন এবং আর্জেন্টিনার সব মানুষের ভালোবাসা জয় করতে পারাটাকে আমি নিজের একটি বড় অর্জন হিসেবে দেখি। আজ দেশের ৯৫ কিংবা ১০০ শতাংশ মানুষ আমাকে ভালোবাসে। এই অনুভূতিটা সত্যিই অসাধারণ।”

২০১৬ সালের সেই রাতটির কথা মনে করে আর্জেন্টিনার সমর্থক বেঞ্জামিন বলেন, মেসির অবসর ঘোষণা মানুষকে বুঝিয়েছিল তারা তাকে কতটা ভালোবাসে।

তার ভাষায়, “মেসি যখন অবসর নিল, আমি কেঁদেছিলাম, পুরো দেশ কেঁদেছিল। তাকে নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেটাও ছিল কারণ মানুষ তাকে এত বেশি ভালোবাসত এবং তার কাছে এত বেশি প্রত্যাশা করত।”

অর্থাৎ, যে সমালোচনা একসময় মেসিকে জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্তে নিয়ে গিয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেই একই আবেগ পরিণত হয়েছে গভীর ভালোবাসায়।

জার্সি নম্বর ১৯ থেকে ১০

মেসির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ১৯ নম্বর জার্সি পরে। ২০১৪ সাল থেকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ১০ নম্বর হয়ে ওঠে তার পরিচয়ের অংশ।

ক্যারিয়ারের শেষে ১০ নম্বর জার্সির মেসির নামের পাশে রয়েছে দুটি গোল্ডেন বল এবং একটি বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনার হয়ে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যে মেসি একসময় সমালোচনার কেন্দ্রে ছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়ে উঠেছেন দেশটির ফুটবলের অন্যতম বড় প্রতীক।

সোর্স: বিবিসি বাংলা

Scroll to Top