জানেন কি বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ইথিওপিয়া-সোমালিয়ার চেয়েও কম?

মোবাইল ইন্টারনেটের গতিতে এখনও পিছিয়ে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ মোবাইল ইন্টারনেটের গতির দিক দিয়ে ভারত কিংবা পাকিস্তানের থেকে পিছিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় শুধুমাত্র আফগানিস্তানে বাংলাদেশের চাইতে কম গতির ইন্টারনেট রয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের মোবাইল ইন্টারনেটের গতি আফ্রিকার দরিদ্র দেশ ইথিওপিয়া ও সোমালিয়ার চাইতেও খারাপ অবস্থা।

অনলাইনে ইন্টারনেটের গতি দেখা যায়, এমন একটি জনপ্রিয় ওয়েবসাইট স্পিডটেস্ট’র গ্লোবাল ইনডেক্সের গত জানুয়ারি মাসে প্রকাশ করা সূচকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। অথচ বাংলাদেশে মোবাইল অপারেটরগুলো অনেকদিন ধরেই ফোরজি গতির ইন্টারনেট সেবা দিয়ে আসছে বলে দাবি করছে। এমনকি খুব শিগগিরই তারা ইন্টারনেটের নব প্রযুক্তি ফাইভজি সেবা দেবে এমন কথাও বলছে। আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না দিলেও বড় একটি মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা তাদের ইন্টারনেটের গতি কম থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।

টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী বলেছেন, ‘মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর যে পরিমাণে ইন্টারনেট গ্রাহক রয়েছে তার চাইতে স্পেকট্রাম বা তরঙ্গের পরিমাণ কম। ফলে ইন্টারনেটের গতি কম হচ্ছে।’

এমন পরিস্থিতিতেই আগামী সোমবার নতুন স্পেকট্রাম বরাদ্দের জন্য নিলাম আয়োজন করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এই নিলাম থেকে অপারেটররা প্রয়োজনীয় স্পেকট্রাম কিনে নেয়ার পর ইন্টারনেট সেবার অগ্রগতি হবে বলে তারা আশা করছেন।

যোগাযোগের জন্য সাধারণ মানুষ মোবাইল ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করে

বাংলাদেশের গ্রাহক অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশের যেসব মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করেন তাদের একটি বড় অংশই যোগাযোগ, ব্রাউজিং বা বিনোদনের ক্ষেত্রে মোবাইল ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই মোবাইল ইন্টারনেটের গতি নিয়ে মানুষের অভিযোগের শেষ নেই।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মাইমুনা সুলতানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ সক্রিয়। তার নিজের একটি ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল আছে, যেখানে তিনি লাইভ স্ট্রিম করেন, ছবি বা ভিডিও আপলোড করেন। কিন্তু সম্প্রতি ইন্টারনেট গতি না পেয়ে মোবাইলের অপারেটর বদলেছেন। কিন্তু তেমন কোনো লাভ হয়নি তার।

দুটি অপারেটর তাদের বিভিন্ন বিজ্ঞাপন ও প্রচারণায় দেশব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগের দাবি করলেও মাঝে মাঝে ঢাকার ভেতরেই সংযোগ পেতে ঝামেলা পোহাতে হয় মাইমুনা সুলতানাকে। বিশেষ করে কোনো ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ড কিংবা ১২তলার ওপরে গেলে তিনি তার অপারেটর থেকে আর নেটওয়ার্ক পান না।

ঢাকার বাইরে অনেক জেলাতেও একই জটিলতার মুখে পড়তে হয় তাকে। এভাবে যখন তখন সংযোগ চলে যাওয়া বা ইন্টারনেট স্পিড কমে যাওয়ার কারণে তিনি যে প্যাকেজগুলো কেনেন তার বেশিরভাগই অপচয় হয়ে যায়।

মাইমুনা সুলতানা বলেন, ‘আমরা গত মাসে শ্রীমঙ্গলে ঘুরতে গিয়েছিলাম। জায়গাটা এমন দুর্গম কোথাও না, শহরের কাছেই। কিন্তু আমার দুটো অপারেটরের একটাতেও ইন্টারনেট কানেক্ট করতে পারিনি। অথচ দুটোতেই আমি সাত দিনের প্যাকেজ কিনে রেখেছিলাম। আমার পুরো টাকাটাই অপচয়।’

তিনি বলেন, ‘আমার অফিস ঢাকাতেই একটা বহুতল ভবনের ১২তলার ওপরে। সেখানেও নেটওয়ার্ক পেতে ঝামেলা হয়। ওয়াইফাই থাকায় কাজ চালিয়ে নিতে পারি।

মোবাইল অপারেটরগুলো ফোরজি ইন্টারনেট দেয়ার দাবি করলেও সেটার সাথে পারফর্মেন্সের কোনো মিল নেই বলে অভিযোগ করেছেন সাদিয়া হক। তিনি অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনা করছেন, সেক্ষেত্রে দিন-রাত তাকে ইন্টারনেট সংযোগের ওপর নির্ভর করতে হয়।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘ওরা দাবি করে ফোরজি স্পিড, কিন্তু আমি লাইভ করতে গেলে কিছুক্ষণ পরেই ফুটেজ এতো খারাপ আসে। ফোরজিতে তো এমন হওয়ার কথা না। মাঝে মাঝে ইউটিউবে বাফারিং হয়। অথচ টাকা তো কম নিচ্ছে না। অন্য দেশের চাইতে বেশিই নিচ্ছে।’

স্পিডটেস্ট’র সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান
প্রতিষ্ঠানটি মোট ১৪০টি দেশের মোবাইল ইন্টারনেটের গতি জরিপ করেছে, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৬তম। যা গত বছরের চাইতে এক ধাপ পিছিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে মালদ্বীপ। দেশটির অবস্থান ৪৫তম। ৮৮তম অবস্থানে রয়েছে মিয়ানমার। নেপালের অবস্থান ১১৪তম। এর চার ধাপ পিছিয়ে ১১৮তম অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। ১২০তম অবস্থানে শ্রীলঙ্কা। ভারত ১৩১তম অবস্থানে এবং সবচেয়ে নিচে ১৪০তম অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান।

মোবাইলের ইন্টারনেটের গতিতে সবচেয়ে এগিয়ে আছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ১৮৩ এমবিপিএসের বেশি। তার পরেই রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, কাতার, চীন, সৌদি আরব, নরওয়ে, কুয়েত ও অস্ট্রেলিয়া।

এই প্রতিটি দেশের মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ১০০-১৭০ এমবিপিএসের বেশি। সে হিসেবে ১৩৬তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ১০.৫৭ এমবিপিএস। যেটা কিনা ভারতে ১২.৪১ এমবিপিএস এবং পাকিস্তানে প্রায় ১৮ এমবিপিএস।

অবশ্য ওই একই সূচকে ফাইবার অপটিক কেবলের মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতিতে অন্য অনেক দেশের চাইতেই এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। সেখানে ১৭৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৬, যা গত বছরের চাইতে এক ধাপ এগিয়ে এসেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ডাউনলোড গতি গড়ে ৩৩.৫৪ এমবিপিএস বলে ওই সূচকে উঠে এসেছে। সে হিসেবে তুরস্ক, গ্রীসের চাইতেও এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। এমনকি মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার চাইতেও বাংলাদেশ এই ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গতিতে কয়েক ধাপ এগিয়ে আছে।

বাংলাদেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের স্পিড বেশি থাকার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, এই ইন্টারনেট মানুষ কেবলের মাধ্যমে ব্যবহার করে। যেখানে কিনা মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করে স্পেকট্রাম বা বেতার তরঙ্গ।

ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের এই কেবল দেশের প্রতিটি পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার কারণে নেটওয়ার্ক পেতে কোনো সমস্যা হয় না।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোবাইল ইন্টারনেটের সংযোগ পেতে অনেকের সমস্যা হয়

মোবাইল ইন্টারনেটের গতি বাড়াতে কী করা হচ্ছে
ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মোবাইল অপারেটরগুলোর যে পরিমাণ গ্রাহক রয়েছে, সে হিসেবে তাদের স্পেকট্রাম বা বেতার তরঙ্গ ব্যবহারের পরিমাণ কম। ধরুন, একটি অপারেটরের গ্রাহকের সংখ্যা ৮ কোটি। কিন্তু তাদের স্পেকট্রাম বরাদ্দ আছে মাত্র ৩৭ মেগাহার্টজ। যেখানে গ্রাহক হিসেবে তাদের থাকার কথা ছিল ১০০ মেগাহার্টজের মতো। এই বেতার তরঙ্গই হলো মোবাইল নেটওয়ার্কের মেরুদণ্ড। এটি ঠিক না থাকলে, কোনোটাই ঠিক থাকবে না।’

মোস্তাফা জব্বার বলেছেন, ‘গত এক বছর বাংলাদেশে ব্যান্ডউইথের ব্যবহার দুই গুণ বেড়েছে। কিন্তু এর সাথে মানিয়ে নিতে টেলিকম প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা অর্থাৎ তাদের বেতার তরঙ্গের ব্যবহার সে অনুপাতে বাড়েনি। এ কারণে গ্রাহকরা তাদের কাঙ্ক্ষিত ইন্টারনেটের গতি পাচ্ছে না। আমরা টুজি থেকে থ্রিজিতে আসতে ২৪ বছর সময় নিয়েছি। ২০১৩ সালে থ্রিজি আসার ৫ বছরের মাথায় ২০১৮ সালে আমরা ফোরজিতে আসি। ২০১৯ সালে অপারেটরগুলো প্রস্তুতিমূলক কিছু কাজ করেছে। ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের কারণে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজ সেভাবে এগোয়নি।’

এখন মোবাইল ইন্টারনেটের এই গতি বাড়ানোর লক্ষ্যে ৮ মার্চ বেতার তরঙ্গ নিলাম করতে যাচ্ছে বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। অব্যবহৃত যে বেতার তরঙ্গ আছে তার পুরোটাই নিলামে তোলা হবে। মোবাইল অপারেটররা তাদের গ্রাহকের সংখ্যা হিসেবে যদি এই নিলাম থেকে বেতার তরঙ্গ কেনার সুযোগ গ্রহণ করেন। তাহলে মার্চের পর থেকেই ইন্টারনেটের গতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করেন মন্ত্রী।

মোবাইল অপরেটর প্রতিষ্ঠানগুলো এই বেতার তরঙ্গ কেনার ব্যাপারে আবেদন করেছে। এছাড়া যেখানে ফাইবার অপটিকস আছে, সেখান থেকে তারা কেবল টেনে নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারতো। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় যেখানে বেতার তরঙ্গে সমস্যা হয় সেখানে বড় ব্যান্ডউইথ নিতে ফাইবার অপটিকস কাজে আসতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মোবাইল অপারেটর কিংবা নেশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক-এনটিটিএন সেই কাজটিও করতে পারেনি। এমন অভিযোগ করেছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।

২৬ মার্চের মধ্যে বাংলাদেশের ৮০% গ্রাহককে ফোরজি ইন্টারনেট সেবার মধ্যে আনতে টেলিকমগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে দেশের প্রধান দুটি মোবাইল অপারেটর কাজ করে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাড়তি বেতার তরঙ্গ যোগ হলে গ্রাহক সেবার মানও আগের চাইতে ভালো হবে বলে আশা করেন মোস্তাফা জব্বার।

বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের কাছে ফোরজি হ্যান্ডসেট না থাকাও এই ইন্টারনেট সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আরেকটি কারণ।

সংবাদ সূত্রঃ বিবিসি বাংলা