ভারতে স্ত্রী, শাশুড়িকে হত্যা করে আত্মহত্যার আগে ৬৭ পৃষ্ঠার নোট রেখে গেছেন অমিত

Crime

সাংসারিক জীবনের সমস্যা হল জীবনের বড় সমস্যা গুলোর মধ্যে অন্যতম। কর্নাটক থেকে তামিলনাড়ু, বিহার- স্ত্রীকে মারতে পেশাদার কিলারের খোঁজে ছুটেছিলেন অমিত আগরওয়াল। বিষাক্ত সাপের কামড় বা গাড়ি চাপা দেওয়ার পরিকল্পনাও করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত সে সব ভাবনায় ভরসা পাননি বলে রবিবার বেঙ্গালুরুর ফ্ল্যাটে স্ত্রীকে নিজের হাতেই শ্বাসরোধ করে খুন করে মৃতদেহ সেখানেই লুকিয়ে রেখে দেন অমিত। তার পর একই আবাসনে নিজের গেস্ট রুমে ফিরে নির্বিকার মুখে ১০ বছরের ছেলেকে রান্না করে খাওয়ান। মাঝরাতে দু’জনের কলকাতা ফেরার বিমানের টিকিট বুক করেন। সোমবার দুপুরে ছেলেকে নিয়ে কলকাতায় পৌঁছে আগে ছেলেকে দাদার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। তার পর ঠাণ্ডা মাথায় শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ছক কষে শাশুড়িকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে খুন, ও শেষে সেই বন্দুকের গুলিতেই আত্মহত্যা।

পেশায় চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট অমিত। সম্পর্কের টানাপোড়েনে দীর্ঘদিন ধরেই বিবাহবিচ্ছেদের মামলা করা স্ত্রী শিল্পীকে খুন করতে নানা ছক কষছিলেন, সেই খোঁজ মিলেছে ছাপার অক্ষরে লেখা অমিতের ৬৭ পাতার আত্মকথনে। অমিতের শ্বশুরবাড়িতে তার ও শাশুড়ির মৃতদেহের পাশে পাওয়া অমিতের ব্যাগ থেকে মেলে ওই দীর্ঘ সুইসাইড নোট, যার শিরোনাম ‘মহাভারত অফ মাই লাইফ’। ঘটনাচক্রে বেঙ্গালুরুর ফ্ল্যাট থেকেও একটি তিন পাতার ‘নোট’ মিলেছে। কিন্তু যে অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে শাশুড়ি ললিতা ও নিজেকে গুলি করেন অমিত, সেটি তাকে কে সরবরাহ করল? তদন্তকারীদের ধারণা, বিমানবন্দর থেকে ফুলবাগানে শ্বশুরবাড়ি ঢোকার মধ্যেই পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী কেউ তার হাতে অস্ত্র তুলে দেন। সেই অস্ত্রের উৎস সন্ধানে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন তদন্তকারীরা।

রবিবার ‘ঘোরাতে নিয়ে যাচ্ছি’ বলে বছর দশেকের ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে সেই গেস্ট রুমে যান অমিত। তার পর ছেলেকে সেখানেই রেখে একটু পরে ফের শিল্পীর ফ্ল্যাটে ফেরেন। ছেলে ফিরেছে ভেবে শিল্পী দরজা খুললে জোর করে ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়েন অমিত। সোমবার শিল্পীর দেহ উদ্ধারের সময় দু’জনের মধ্যে তীব্র ধস্তাধস্তি, রান্নাঘরে কাচের ভাঙা পাত্র, বাসনপত্র পড়ে থাকার চিহ্ন পেয়েছে বেঙ্গালুরুর পুলিশ। তাদের মতে, শ্বাসরোধ করে অমিত শিল্পীকে খুন করে রান্নাঘরে একটি কাবার্ডের পাশে দেহ লুকিয়ে রেখে চুপচাপ গেস্ট রুমে ছেলের কাছে ফিরে যান।
স্ত্রীকে খুনের কথা ছেলেকে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দেননি অমিত। নিজেই রান্না করে ছেলেকে খাওয়ান।

একসঙ্গে দু’জনে সময় কাটান। রবিবার রাত ১টার পর কলকাতা আসার জন্য ছেলের ও নিজের নামে বিমানের টিকিট কাটেন অনলাইনে। সোমবার দুপুর দেড়টার বিমানে ছেলেকে নিয়ে ওঠেন। অমিত-শিল্পীর ১০ বছরের ছেলে মঙ্গলবার পুলিশকে জানিয়েছে, মা হঠাৎ কলকাতায় গিয়েছে বলে তারাও কলকাতা যাচ্ছে- বাবা এমনটাই বলেছিল। সোমবার বিকেলে সাড়ে ৪টা নাগাদ কলকাতায় নামেন অমিত। তবে তার আগেই, রবিবার রাতে এক বন্ধুকে ফোন করে গাড়ি নিয়ে বিমানবন্দরে আসতে বলেছিলেন অমিত। সেই মতো বিমানবন্দরে পৌঁছেও যান ওই বন্ধু। তার গাড়িতে তিন-চারটা ব্যাগ তুলে দেন অমিত। দাদার বেলঘরিয়ার বাড়ির ঠিকানা দিয়ে ছেলেকে সেখানে পৌঁছেও দিতে বলেন। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে গাড়িতে তুলে দেন অমিত। ওই ব্যক্তির সঙ্গে ইতিমধ্যেই কথা বলেছেন তদন্তকারীরা। কলকাতার বাসিন্দা ওই যুবক পুলিশকে জানান, এক সময় তিনি অমিতের সঙ্গে কাজ করতেন। কলকাতায় এলে অমিত দেখাও করতেন। কিন্তু সেই বন্ধু যে এ বার স্ত্রীকে খুন করে কলকাতা ফিরেছেন এবং আরও খুনের পরিকল্পনা করছেন, তেমন ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি তিনি। কিন্তু অমিত তো কলকাতা পুলিশের হাতে পড়ার আগেই আত্মঘাতী। তা হলে বেঙ্গালুরুতে স্ত্রীকে খুনের খবর মিলল কী করে?

অমিতের শাশুড়ি ললিতা তাঁর গুলিতে মারা গেলেও সোমবার ফুলবাগানের ফ্ল্যাট থেকে কোনওক্রমে পালিয়ে বেঁচে যান শ্বশুর সুভাষ। জামাইয়ের ‘টার্গেট’ ছিলেন তিনিও। স্ত্রীর ভাইকেও হত্যা করতে চেয়েছিলেন অমিত। পরে পুলিশকে সুভাষ জানান, ললিতাকে যে অমিত খুন করেছে, সে কথা গুরুগ্রামে থাকা ছেলেকে ফোন করে জানিয়েছিলেন তিনি। বেঙ্গালুরুতে থাকা মেয়েকেও একই কারণে ফোন করতে গেলে দেখেন, মোবাইল সুইচড অফ। তাতেই খটকা লাগে সুভাষের, পুলিশেরও।

সেই সূত্রেই অমিতের মৃতদেহের পাশে পড়ে থাকা কালো ব্যাগ তল্লাশি করতে গিয়ে একটি প্লাস্টিক ফোল্ডারে দীর্ঘ সুইসাইড নোট পায় পুলিশ। গোটা নোটটি টাইপ করা হলেও শেষ পাতায় হাতের লেখা। স্ত্রীকে দীর্ঘদিন ধরে যে খুনের যে ছক করেছিলেন অমিত, তা স্পষ্ট হয় নোটের ওই পাতায় লেখা ‘এক্সিকিউটেড’ শব্দে। কলকাতা পুলিশের থেকে খবর পেয়ে বেঙ্গালুরুর ফ্ল্যাটে পৌঁছায় সেখানকার পুলিশ। দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে রান্নাঘরে কাবার্ডের পাশে বসানো শিল্পীর মৃতদেহ উদ্ধার হয়। স্ত্রীকে খুনের পর অমিত সেটি সুইসাইড নোটের শেষ অংশে লেখেন বলে অনুমান। পুলিশ তখন এটাও ভেবেছিল, হয়তো বাচ্চাকেও শেষ করে দিয়েছেন অমিত। কিন্তু কলকাতা পুলিশ অমিতের মোবাইলের সূত্র ধরে তার দাদাকে ফোন করে জানতে পারে, বিমানবন্দর থেকেই ছেলেকে সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন অমিত।
: এই সময়