এবার বাংলাদেশের প্রশংসায় পঞ্চমুখ আনন্দবাজার

bangladesh

ক্রয়ক্ষমতার বিবেচনায় মাথাপিছু দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ রাষ্ট্র ভারতকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। গত বছরের অক্টোবরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল তহবিল- আইএমএফ’র দেয়া ওয়ার্ল্ড আউটলুকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমনটাই জানানো হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালের শেষ নাগাদ ক্রয়ক্ষমতার বিবেচনায় (পিপিপি) বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ দাঁড়াবে ১ হাজার ৮৮৮ ডলাার আর এসময়ে ভারতের জনপ্রতি জিডিপির পরিমাণ দাঁড়াবে ১ হাজার ৮৭৭ ডলারে।

এরপরেই ভারত জুড়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। আইএমএফ-এর রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসতেই মোদি সরকারকে নিশানা করেন দেশটির বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। কটাক্ষের সুরে টুইটে লেখেন, গত ৬ বছরে বিজেপির বিদ্বেষমূলক জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতির দুর্দান্ত সাফল্য হলো, বাংলাদেশ ভারতকে ছাপিয়ে যেতে চলেছে। কড়া সমালোচনা করতে ছাড়েননি তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও।

তার টুইট, ভারতের অর্থনীতি ক্ষয়িষ্ণু। এমনকি বাংলাদেশও মাথাপিছু জাতীয় উৎপাদনে আমাদের ছাপিয়ে যেতে চলেছে। মন দিয়ে শুনুন, এটা ওদের উত্তরণ নয়, আমাদের মহাপতন। এটাই নরেন্দ্র মোদিজির ৫ লক্ষ কোটির অর্থনীতির স্বপ্ন!

তবে আইএমএফের সাম্প্রতিক রিপোর্ট নিয়ে মোদি সরকারের অন্দরের ব্যাখ্যা হলো, ক্রয় ক্ষমতার নিরিখে ২০১৯ সালে ভারতের দেশজ মোট উৎপাদন বাংলাদেশের থেকে ১১ গুণ বেশি ছিল। ভারতের জনসংখ্যা বাংলাদেশের ৮ গুণ, সমালোচনার জবাব হিসেবে সেই যুক্তিও তুলে ধরা হচ্ছে।

এমন একটি বিষয় নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম আনন্দবাজারের সম্পাদকীয়তে ‘ঠাকুরঘরে’ শিরোনামে বাংলাদেশের এ প্রাপ্তি থেকে ভারতের শিক্ষা নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রশংসা করে আনন্দবাজারের সম্পাদকীয়তে যা লেখা রয়েছে…

নবজাত দেশের নুতন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান যখন ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতার মাটিতে অবতরণ করে ময়দানে বক্তৃতা শুরু করলেন, ততক্ষণে সমগ্র ঙ্কলকাতা মহানগরই কলরোল-উচ্ছ্বসিত ময়দানে পরিণত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সে দিন কলিকাতার বুকে দাঁড়িয়ে কেবল উদাত্ত কণ্ঠে বিজয়বার্তা ঘোষণা করেন নাই, বিপন্ন এবং নিঃস্ব একটি নবজাত রাষ্ট্রের তরফে বাঙালির শুভেচ্ছাও প্রার্থনা করেহছিলেন। ঊনপঞ্চাশ বৎসর অতিক্রান্ত হয়েছে, এই ফেব্রুয়ারিতে পঞ্চাশ বৎসরে পড়লো সেই দিনটির ইতিহাস। সে দিনের সদ্যোজাত ক্ষুদ্র দেশ এখন মহাগৌরবে উপমহাদেশীয় অঞ্চলের মুখোজ্জ্বল করতে ব্যস্ত। বাংলাদেশের উন্নতি দেখে এই উপমহাদেশের অন্যান্য দেশ, এমনকি তথাকথিত আঞ্চলিক মহাশক্তিরাও আজ ঈর্ষান্বিত। ঢাকার বিদেশি মুদ্রা ভান্ডার এখন ইসলামাবাদের তিনগুণ।

পাক প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানকে সুইডেন বানাইবেন বললে উপদেষ্টারা বলেন, আগে তো বাংলাদেশের সমকক্ষ হন, তার পর সুইডেন। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডারের ২০২০ সালের হিসাব— জনপ্রতি জিডিপি-র দিক দিয়া বাংলাদেশ ভারতকে পিছনে ফেলেছে। কোভিড-পূর্ব কালেই দুই দেশ এই স্থানে এসেছিল। অতঃপর কোভিড-১৯ ভারতীয় অর্থনীতিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অপেক্ষা বিপন্নতর করেছে। যেহেতু যে কোনও যাত্রারই চরিত্র নির্ধারিত হয় তাহার সূচনাবিন্দুর উপর নির্ভর করে: ১৯৭২ সালে ভারত যে অবস্থায় ছিল, আর নূতন বাংলাদেশ (যাকে আমেরিকার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঙ্গার ‘বাসকেট কেস’ বলিয়া অভিহিত করেছিলেন) যেখানে ছিল, তাহা মাথায় রাখলেই বোঝা যায়, কে কতখানি এগিয়ে গেছে বা পিছিয়েছে।

আইএমএফ-এর হিসাব আন্তর্জাতিক গোচরে আসার সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় ও উদ্বিগ্ন বিজেপি আইটি সেল বোঝাতে শুরু করেছে, কেন বাংলাদেশ ও ভারতের এই তুলনা আসলে বাস্তবের যথার্থ প্রতিফলন নয়। আইটি সেল-এর যুক্তিতর্কের ধরনধারণের সঙ্গে পরিচিতরাই বুঝবেন, কী ধরনের মারপ্যাঁচ এই বক্তব্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যবহৃত ভয়েছে। বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্প সেক্টরই তাকে কোভিড-সঙ্কটে বাঁচাইয়াছে, এমন যুক্তিও সেই মারপ্যাঁচে স্থান পেয়েছে— যদিও বোঝা দুষ্কর, ভারতকে সেই শিল্পে বা সমস্তরের কোনও শিল্পে মনোনিবেশ করিতে কে কবে বাধা দিয়েছিল। আরও একটি কথা। উন্নয়ন বোঝার জন্য যে জিডিপি-ই একমাত্র হিসাবের খাতা নয়, মানুষের মৌলিক চাহিদা ও জীবনমানের পরিস্থিতিও যে তাহার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সূচক, এমন কথা অমর্ত্য সেন প্রমুখ অর্থনীতিবিদ বারংবার বলেছেন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, কিভাবে যে ভারত এক কালে মানব-উন্নয়ন সূচকে উপমহাদেশীয় তালিকার একেবারে উপরের দিকে ছিল, সে ক্রমে তালিকার নিম্নবর্গে স্থান করে নিয়েছে।

২০২০ সালের শেষে, নাগরিকের গড় আয়ু ভারতের অপেক্ষা বাংলাদেশে তিন বছর বেশি, শিশুমৃত্যুর হার ভারতের অপেক্ষা কম (হাজারে ভারত ২৮, বাংলাদেশে ২৫), সাক্ষরতায় দুই দেশ পাশাপাশি, শহর-জনসংখ্যার হারে বাংলাদেশ (৩৭ শতাংশ) ও ভারত (৩৪ শতাংশ) এবং— নারী কর্মসক্ষমতার দিক দিয়ে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে (ভারত ২০ শতাংশ, বাংলাদেশ ৩৬ শতাংশ)। কে কোন দিকে অনুপ্রবেশ করবে, তাই এখন প্রশ্ন। এই সমগ্র চিত্রের সমস্ত ‘দায়িত্ব’ যে দিল্লির বর্তমান শাসক দলকেই নিতে হবে, এমন নয়, যদিও গত কয়েক বৎসরে পরিস্থিতি উপর্যুপরি খারাপ হয়েহচে। কিন্তু বর্তমান শাসকের ‘ঠাকুরঘরে কে’ ভাবটিই সাক্ষাৎ প্রমাণ, তারা নিজেরাই নিজেদের ‘অপরাধ’-এর ভাগিদার ভাবে। অথচ বাংলাদেশের সমৃদ্ধির মতো ঘটনাকে আইটি সেল-এর অপপ্রচারের হাতে ছেড়ে না দিয়ে দিল্লির উচিত ছিল, অর্থনীতিবিদ ও সমাজতাত্ত্বিকদের সাহায্য নিয়ে সেই দেশ হতে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করে কিভাবে আমরাও এগিয়ে যাব।