এলএনজি নির্ভরতার ফাঁদে বিদ্যুৎ–জ্বালানি খাত: ঋণ, ভর্তুকি ও অর্থনীতির নীরব বিপর্যয়?

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এখন বড় সংকটের মুখোমুখি। দীর্ঘদিন দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় উৎপাদন কমেছে। ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সাল থেকে কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। পরের বছর ২০১৯ থেকে সিঙ্গাপুরের স্পট মার্কেট ও যুক্তরাষ্ট্র থেকেও আমদানি বাড়ে। শুরুতে এটি ছিল জরুরি সমাধান, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে তা ব্যয়বহুল নির্ভরতায় রূপ নিয়েছে।

বিএনপি তার ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতা গ্রহণের পর কিছুটা ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি জ্বালানি মন্ত্রণালয় ১০০ দিনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। তাতে দেখা যায়—আওয়ামী লীগের মতোই বিএনপি আরও বেশি এলএনজি আমদানি সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। এজন্য কক্সবাজারে আরও একাধিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, তবে কি একটি ব্যয়বহুল আমদানি নির্ভরতার চক্রে আটকে যাচ্ছে এই খাত?

এলএনজির অতি ব্যয়বহুল আমদানি ব্যয়

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতা ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দুটি টার্মিনালের মাধ্যমে এই গ্যাস সরবরাহ করা হয়। যার একটি মালিকানা ইউএস কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি ও অপরটির মালিক সামিট গ্রুপ।

পরিমাণের দিক থেকে এই ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অত্যন্ত কম। কিন্তু অবাক ব্যাপার হল, এই সামান্য গ্যাস আমদানির চাপই সইতে পারছে না বাংলাদেশের অর্থনীতি। ২০২২ সালে জ্বালানি আমদানির চাপে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে ব্যাপক ধস নামে। অথচ জাপান-কোরিয়াকে টেক্কা দেওয়ার অংশ হিসেবে এলএনজি আমদানি শুরু করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। পরে সেই আমদানি নির্ভরতাই আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকে দ্রুত পিচ্ছিল করে তোলে। জ্বালানি খাতের বিপুল ব্যয় জনজীবন জেরবার করে দেয়। ফলে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত নিয়ে আওয়ামী লীগকে সবচেয়ে বেশি গঞ্জণা সইতে হয়েছে।

যদিও আওয়ামী লীগ তাতে শিক্ষা নেয়নি। বরং জ্বালানি আমদানির চাপে যখন বাংলাদেশের রিজার্ভ খালি হয়ে গেছে সেই সময় আরও বেশি এলএনজি আমদানি নির্ভর জ্বালানি মহাপরিকল্পনা আইইপিএমপি পাস করে। যেখানে মাসে ৩ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করা হয়।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বছরে গড়ে প্রায় ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হয়। প্রতিটির গড় মূল্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত এলএনজি আমদানিতে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। এ সময় ভর্তুকি দিতে হয়েছে ৩৬ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকার বেশি।

পেট্রোবাংলা তার নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পর গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড থেকেও বড় অঙ্ক নেওয়া হয়েছে। অথচ গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের অর্থ সম্পূর্ণটা জনগণের। এ টাকায় নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান করার কথা। এতোসব সত্বেও এলএনজি আমদানি ব্যয় মেটাতে না পেরে চলতি অর্থবছরে আমদানি বিল মেটাতে পেট্রোবাংলাকে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়েছে।

সরকারি হিসাব বলছে, ২০০৯ সালের তুলনায় বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৩৩০ শতাংশ, এলএনজি আমদানির কারণে গ্যাসের দাম বেড়েছে ৪০০ শতাংশের বেশি। আর বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক লোকসান বেড়েছে ১,৩০০ শতাংশ।

দেশীয় গ্যাসের তুলনায় ১৮ গুণ ব্যয়

২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরুর পর দেশে দফায় দফায় গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরও দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটারে খরচ এখনো ৩ টাকা। পূর্বে যা ছিল মাত্র ১ টাকা। অন্যদিকে আমদানি করা এলএনজির খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৫৫ টাকা। অর্থাৎ এলএনজি প্রায় ১৮ গুণ বেশি ব্যয়বহুল। উচ্চমূল্যে কিনে কম দামে বিক্রি করায় ভর্তুকি বাড়ছে। একই সঙ্গে এলএনজি-চালিত কেন্দ্রের উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় বিদ্যুতের গড় ব্যয়ও বেড়েছে।

এছাড়া এলএনজি চুক্তি ডলারভিত্তিক। ফলে—ডলার সংকট বাড়ছে, রিজার্ভ কমছে, টাকার মান কমছে, আমদানি ব্যয় আরও বাড়ছে। সর্বোপরি এই চক্রটি সামষ্টিক অর্থনীতিকে দুর্বল করছে।

পেট্রোবাংলা ও পিডিবির আর্থিক চাপ

২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরুর পূর্বে পেট্রোবাংলার নিজস্ব এফডিআর ছিল ২৮ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা পেট্রোবাংলার ১৩টি কোম্পানির লভ্যাংশ থেকে আসা। এলএনজি আমদানি শুরুর ৪ বছরের মধ্যে এই টাকা শেষ হয়ে যায়। একসময় লাভজনক সংস্থা হিসেবে পরিচিত পেট্রোবাংলা এখন ঋণনির্ভর। ডলার পরিশোধ, ব্যাংকঋণ ও সরকারি গ্যারান্টির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বকেয়া ৪০–৫০ হাজার কোটি টাকার ঘরে পৌঁছেছে। ক্যাপাসিটি চার্জ ও উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের কারণে এই ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে।

বিনিয়োগ অসামঞ্জস্য

গত সাত বছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ দশমিক ০৫ ট্রিলিয়ন টাকা। অথচ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও ড্রিলিংয়ে বিনিয়োগ হয়েছে নামমাত্র। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানিতে মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান জরিপ এবং কূপ খননে চলতি ও নতুন প্রকল্পে এডিপিতে মোট বরাদ্দ রয়েছে ১ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। এ হিসাবে চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান জরিপ ও কূপ খননে বরাদ্দের ৫১ গুণ।

অন্যদিকে, প্রতি বছর বিদ্যুৎ খাতে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হলেও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয় দেড় হাজার কোটি টাকার নিচে। অথচ জ্বালানি না থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কখনোই সম্ভব নয়।

এছাড়া দেশে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য অন্যান্য উৎসের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এরপরও দেশে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার মাত্র ৩ শতাংশ। সরকার জীবাশ্ম জ্বালানি ভিত্তিক প্রকল্পে ব্যাপক প্রণোদনা দিলেও নবায়নযোগ্য খাতে এটি নেই।

ভর্তুকি ও বাজেটের ওপর চাপ

২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্যাস ও এলএনজি খাতে ভর্তুকি প্রায় ৮,৯০০ কোটি টাকা। আগের বছর ছিল প্রায় ৬,০০০ কোটি। এই ভর্তুকির অর্থ আসে জাতীয় বাজেট থেকে। ফলে—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, জরুরি অবকাঠামো উন্নয়নের মতো মৌলিক খাতগুলো বাধাগ্রস্ত হয়। যদিও বিপুল অর্থ ব্যয়ে এলএনজি আমদানির পরও গ্যাস সরবরাহ বাড়ছে না বরং পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়েছে।

২০২৪-২৫ সালে গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২,৫২৬ মিলিয়ন ঘনফুট/দিন, যা আগের বছরের তুলনায় কম। আবার চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে গড়ে ২,২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে পেট্রোবাংলা। অর্থাৎ এলএনজি আমদানি বাড়ছে, কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা স্থিতিশীল হচ্ছে না।

বিকল্প কী?

১. নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর। বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বিশাল যে সম্ভাবনা রয়েছে সেটি কাজে লাগানো। শিল্পাঞ্চলে সৌর ও বায়ু প্রকল্প সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ নেওয়া।

২. দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার: অনশোর ও অফশোর ব্লকে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানো। দ্রুত কূপ খনন কর্মসূচি নেওয়া। অনুসন্ধান বাজেট বহুগুণ বাড়ানো।

একটি মাঝারি আকারের গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারই বছরে হাজার কোটি টাকার আমদানি কমাতে পারে।

Scroll to Top