গলছে সম্পর্কের বরফ, আবার কেন চীনের দিকে ঝুঁকছে পশ্চিমারা?

দীর্ঘ আট বছর পর যুক্তরাজ্য আবারও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একাধিক উচ্চপর্যায়ের সফরের পর এই উদ্যোগ নিল দেশটি।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গত জানুয়ারিতে বেইজিং সফরকে ‘দীর্ঘ এক কূটনৈতিক বরফযুগ’ ভাঙার প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার তিন দিনের জন্য চীন সফর করছেন। দুই দেশ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে, যদিও নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে মতপার্থক্য এখনও রয়ে গেছে।

এর আগে ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্টও পরপর চীন সফর করেছিলেন।

বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে নতুন কূটনৈতিক প্রবণতা
যুক্তরাজ্য একা নয়- বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে কূটনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের চীন সফরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, জার্মানি, কানাডা ও ফিনল্যান্ডসহ বহু দেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরায় সক্রিয় করছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী কুপার বেইজিংয়ে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতে বলেন, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশের একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন। এর মধ্যে ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর ইবোলা পরিস্থিতিও রয়েছে।

তিনি বলেন, “নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বজায় রাখা এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উত্তেজনা কমানো আমাদের যৌথ স্বার্থ।”

যুক্তরাষ্ট্র-চীন টানাপোড়েন ও পশ্চিমা কৌশল পরিবর্তন
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা দেশগুলোর এই কূটনৈতিক পুনর্গঠন কেবল দ্বিপাক্ষিক বিষয় নয়; বরং এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জন মিনিচ বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো এখন চীনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল- বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অ্যারোস্পেস খাতে।

তিনি বলেন, “এই নির্ভরতা প্রতিদিন বাড়ছে। এটি পশ্চিমের জন্য কতটা টেকসই, সেটি এখন বড় প্রশ্ন।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাজ্য এখন চীনের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিরোধী অবস্থান নিতে পারছে না, কারণ তার অর্থনৈতিক প্রয়োজন ও বৈশ্বিক অবস্থান তা অনুমোদন করছে না।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা
২০২৪ সালের জুলাইয়ে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি চীন সফর করেন এবং পরে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন।

এই সময়কালে ব্রিটিশ ওষুধ কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকার ১৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য ভিসা সুবিধা সম্প্রসারণ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং বেইজিংয়ে বলেন, দুই দেশের উচিত ‘পারস্পরিক সংলাপ ও সহযোগিতা বাড়িয়ে বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা’।

প্রযুক্তি, জ্বালানি ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতা
যুক্তরাজ্য চীনের প্রযুক্তি ও সবুজ জ্বালানি খাতে সহযোগিতার দিকে বিশেষভাবে আগ্রহী। চীন বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সস্তা ও পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি যুক্তরাজ্যের জ্বালানি রূপান্তরকে দ্রুততর করতে পারে। তবে গবেষক জিং গু সতর্ক করে বলেন, এই সম্পর্ক যেন একতরফা নির্ভরতায় পরিণত না হয়।
তিনি বলেন, “মধ্যম শক্তির দেশগুলো এখন কেবল পক্ষ বেছে নিচ্ছে না; তারা সময় কিনছে- অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সবুজ রূপান্তর এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য।”

নিরাপত্তা ও মানবাধিকার ইস্যুতে উত্তেজনা
অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়লেও লন্ডন ও বেইজিংয়ের মধ্যে গভীর আস্থার সংকট রয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে চীনা গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে যুক্তরাজ্যে কয়েকজনের গ্রেফতার, এবং চীনের জন্য লন্ডনে একটি নতুন ‘মেগা দূতাবাস’ অনুমোদন ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এছাড়া হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী নেতা জিমি লাইয়ের কারাবাস নিয়েও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ ও সরবরাহ চেইন নিয়ে ভবিষ্যতে এই উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।

আদর্শগত বিভাজন অমীমাংসিত
লন্ডনের সোয়াস (SOAS) চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্টিভ সাং বলেন, যুক্তরাজ্য ও চীনের মধ্যে মৌলিক রাজনৈতিক ও আদর্শগত পার্থক্য রয়ে গেছে, যা পুরোপুরি মেটানো সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, “কূটনীতি মানে হলো পার্থক্যকে পাশ কাটিয়ে পারস্পরিক স্বার্থের জায়গায় এগিয়ে যাওয়া। ঠিকভাবে করলে এটি দুই পক্ষেরই উপকারে আসে।” সূত্র: আল-জাজিরা

Scroll to Top