পাকিস্তানের সঙ্গে এবার প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে চায় কুয়েত

জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে কুয়েতের সঙ্গে একটি বিস্তৃত প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে পাকিস্তান।

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচটি সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স।

সূত্রগুলোর ভাষ্য, আলোচনা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় এই উদ্যোগ জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোয় পাকিস্তানের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইসলামাবাদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।

সৌদি আরবের পর এবার কুয়েত
গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে পাকিস্তান। রয়টার্স এর আগে জানিয়েছিল, ওই চুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে পাকিস্তান জড়িয়ে পড়তে পারে- এমন উদ্বেগ ইসলামাবাদে বাড়ছে।

বিশেষ করে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সম্প্রতি সৌদি আরবে হামলা চালানোর পর পাকিস্তান তেহরানকে জানিয়ে দেয়, সৌদি আরবের ওপর যেকোনও হামলাকে তারা নিজেদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করবে।

এমন পরিস্থিতিতে চলতি বছর ইরানের হামলার মুখে পড়া কুয়েতের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির আলোচনা পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থানকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলতে পারে।

কুয়েতের চাওয়া কী?
২০২৩ সাল থেকে কুয়েত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমিত পরিসরে সামরিক প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়ার চুক্তি রয়েছে।

তবে এখন কুয়েত আরও বিস্তৃত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চাইছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তান সরকারের এক কর্মকর্তা।

তার ভাষ্য, কুয়েত পাকিস্তানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি চায়, যা সৌদি আরবের সঙ্গে ইসলামাবাদের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তির মতো হবে।

এর আওতায় কুয়েতে হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন, যুদ্ধবিমান, ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক অবকাঠামো ও সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

তবে পাকিস্তান এ পর্যায়ে এত বড় সামরিক প্রতিশ্রুতিতে যেতে আগ্রহী নয়।

আলোচনার সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তানের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, “কুয়েতের চাহিদার তালিকায় প্রায় সবকিছুই রয়েছে। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার—এই মুহূর্তে যুদ্ধক্ষম সেনা মোতায়েনের বিষয়টি আমরা বিবেচনা করছি না।”

মধ্যপ্রাচ্যের সূত্রের বক্তব্য
মধ্যপ্রাচ্যের একটি সূত্রও নিশ্চিত করেছে যে, কুয়েত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বিশেষ করে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের বিষয়ে আলোচনা চলছে।

তবে ওই সূত্রের মতে, এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে রূপ নেবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়।

রয়টার্স চারজন পাকিস্তানি ও একজন মধ্যপ্রাচ্যের সূত্রের সঙ্গে কথা বলেছে। তবে তারা কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি পাননি।

এ বিষয়ে পাকিস্তানের সামরিক জনসংযোগ বিভাগ (আইএসপিআর) এবং কুয়েতের তথ্য মন্ত্রণালয় রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

কেন পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে উপসাগরীয় দেশগুলো?
গত এক বছরে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ নতুন আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনে আগ্রহ দেখিয়েছে।

এর অন্যতম কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর আগের মতো নির্ভরশীল থাকতে তারা এখন কিছুটা সতর্ক।

অন্যদিকে পাকিস্তানের বড় ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী রয়েছে এবং দেশটি নিজস্ব প্রযুক্তিতে যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন করে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে পাকিস্তান একটি সম্ভাব্য নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্রের ভাষ্য, কুয়েত পাকিস্তানকে তুলনামূলক নিরাপদ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে।

তিনি বলেন, “পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দেশটির সামরিক সক্ষমতা শক্তিশালী, এটি একটি সুন্নি মুসলিম রাষ্ট্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও তাদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ফলে অন্য অনেক বিকল্পের তুলনায় পাকিস্তানকে নিয়ে রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা কম।”

ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা জোটের উদ্যোগ
সূত্রগুলোর দাবি, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি পৃথক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির খসড়া তৈরির কাজ করছে।

এছাড়া বাহরাইনও একই ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। অন্যদিকে জর্ডান পাকিস্তানের সঙ্গে অস্ত্র সরবরাহ ও সামরিক প্রশিক্ষণবিষয়ক সহযোগিতা চায় বলে তিনটি সূত্র জানিয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিনিয়োগে জোর
পাকিস্তানের জন্য এই আলোচনার আরেকটি বড় উদ্দেশ্য হলো জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ।

সূত্রগুলোর মতে, সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে ইসলামাবাদ কুয়েতের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়াতে চায়।

পাকিস্তানের জ্বালানি মন্ত্রণালয় দেশের তেল ও জ্বালানির কৌশলগত মজুত বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে কুয়েত পাকিস্তানে বন্ডেড ফুয়েল স্টোরেজ স্থাপনের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে, যা দুই দেশের বিদ্যমান সরকার-টু-সরকার ডিজেল সরবরাহ চুক্তির সম্প্রসারণ হবে।

দুটি সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি সহযোগিতা ও বিনিয়োগের মতো প্রস্তাব পাকিস্তানকে আরও বড় প্রতিরক্ষা চুক্তির দিকে এগোতে উৎসাহিত করতে পারে। তাদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা কমে এলে আলোচনাও গতি পাবে।

তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, পাকিস্তানকে অতিরিক্ত সামরিক প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।

সিডনির ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক মুহাম্মদ ফয়সাল বলেন, “পাকিস্তানকে অবশ্যই অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতির সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, তা যেন দেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য ও জাতীয় স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।” সূত্র: রয়টার্স

Scroll to Top