যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাত কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং সাম্প্রতিক আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বহুগুণ বেড়েছে। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। এর কারণে এক দিনেই অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে হামলা এবং জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারের এই ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে।
সংকটের সূত্রপাত ঘটে রবিবার। মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রণালিতে অবস্থিত ইরানের লারাক দ্বীপের দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে হামলা চালায়। জুলাইয়ের শেষের পর এটিই ইরানি ভূখণ্ডে প্রথম কোনো প্রত্যক্ষ মার্কিন সামরিক অভিযান। এর জবাবে ইরানও দ্রুত পাল্টা পদক্ষেপ নেয়। দেশটির বিপ্লবি গার্ড (আইআরজিসি)র বরাতে ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তারা জর্ডানে অবস্থিত দুটি মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। দুই পক্ষের এই মুখোমুখি অবস্থান ও সামরিক তৎপরতা তেলের সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের কারণে। তিনি দাবি করেন, ইরানের অন্যতম প্রধান জ্বালানি হাব খার্গ দ্বীপ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যদিও এই দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি এবং ইরান সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে খার্গ দ্বীপে কোনো হামলা হয়নি। সেখানে তেল উত্তোলনের কাজ স্বাভাবিকভাবেই চলছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকৃত হামলার পাশাপাশি এমন গুঞ্জন এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলা দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত বিশ্ব তেল সরবরাহে যে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, সেই ভয়ই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্ব বাজারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়ে থাকে, কিন্তু বর্তমান যুদ্ধের কারণে নৌচলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক শিপিং তথ্য অনুযায়ী, ছুটির দিনে এই গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজের চলাচল আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর ওপর গত শনিবার প্রণালিতে প্রবেশকালে একটি তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষেপণাস্ত্রের হামলার শিকার হওয়ার পর জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আতঙ্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ বন্ধ ও প্রণালি উন্মুক্ত করতে মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনা স্থগিত থাকায় সংকট নিরসনের কোনো সহজ পথ দেখা যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাজ্যের সরকারি ছুটির কারণে বাজারে লেনদেনের পরিমাণ কম থাকাটাও এই তেলের দাম হঠাৎ করে লাফিয়ে বাড়ার একটি অন্যতম কারণ। ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ব্যারেল প্রতি ৯০ ডলারে এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুড ৮৬ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। যদিও সাম্প্রতিক এই বৃদ্ধির আগে গত সপ্তাহে বড় দরপতনের কারণে পুরো আগস্ট মাসজুড়ে তেলের গড় দামে কিছুটা মন্দাভাব লক্ষ্য করা গিয়েছিল।
তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নিজেদের কৌশলগত মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানকে আরও কোণঠাসা করতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন গৌণ নিষেধাজ্ঞা জারি হতে পারে। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ৪৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসা তাদের ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ ফের পূর্ণ করতে ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে চুক্তির মাধ্যমে সংগৃহীত তেল ব্যবহার করবে।







