ব্রিকসের নয়াদিল্লি ঘোষণা: গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বে নতুন বিশ্বব্যবস্থার ডাক

বিশ্ব শাসনব্যবস্থার সংস্কার, জাতিসংঘকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠ জোরদার, বহুপাক্ষিক বাণিজ্যব্যবস্থা রক্ষা এবং সংঘাত নিরসনে কূটনীতি ও সংলাপের ওপর জোর দিয়েছে ব্রিকস।

ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন শেষে গৃহীত ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’তে এসব বিষয়ে সদস্যদেশগুলোর অভিন্ন অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।

‘স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়ন গড়ে তোলা’ প্রতিপাদ্যে ১২ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। ঘোষণায় পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা, সংহতি, উন্মুক্ততা, অন্তর্ভুক্তি, সহযোগিতা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে সম্প্রসারিত ব্রিকসের সহযোগিতা আরও জোরদারের অঙ্গীকার করা হয়েছে। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও আর্থিক এবং সাংস্কৃতিক ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ—এই তিন স্তম্ভে সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

ঘোষণায় বলা হয়, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ব শাসনব্যবস্থাকে আরও ন্যায্য, কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল ও গণতান্ত্রিক করতে হবে। ব্রিকস নেতারা বহুপাক্ষিকতা ও বহুমেরুকরণের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে জাতিসংঘের কেন্দ্রীয় ভূমিকার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আরও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার প্রসঙ্গেও শক্ত অবস্থান নিয়েছে ব্রিকস। পরিষদকে আরও গণতান্ত্রিক, প্রতিনিধিত্বশীল, কার্যকর ও দক্ষ করার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠ আরও জোরালো করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। ঘোষণায় চীন ও রাশিয়া আবারও ব্রাজিল ও ভারতের জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদে বৃহত্তর ভূমিকা পালনের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একতরফা ও সংরক্ষণবাদী পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্রিকস। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাভিত্তিক উন্মুক্ত, ন্যায্য ও বৈষম্যহীন বহুপাক্ষিক বাণিজ্যব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইথিওপিয়া ও ইরানের ডব্লিউটিও সদস্যপদ লাভের প্রচেষ্টার প্রতি জোরালো সমর্থন জানানো হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়েও গভীর উদ্বেগ জানানো হয় ঘোষণায়। সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়ে বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সংলাপ ও কূটনীতির প্রচেষ্টা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

গাজা পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিকস সদস্যরা যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং বাধাহীন মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার যেকোনও নীতির বিরোধিতা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১৯৬৭ সালের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তের ভিত্তিতে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

ঘোষণায় বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়। সদস্যরা বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়ন অর্থায়নের প্রয়োজন যখন ব্যাপক, তখন সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি উদ্বেগজনক। পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে নিরস্ত্রীকরণ, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।

অর্থনৈতিক ও আর্থিক সহযোগিতায় ব্রিকস স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তি এবং আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদানের আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে। দ্রুত, কম খরচের, সহজলভ্য, স্বচ্ছ ও নিরাপদ আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের জন্য বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ঘোষণায় নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ভূমিকাও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে। উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির অবকাঠামো ও উন্নয়ন চাহিদা পূরণে ব্যাংকটির সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন সম্প্রসারণ, নতুন অর্থায়নের উৎস খোঁজা এবং সদস্যপদ সম্প্রসারণের প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানানো হয়েছে।

প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন সহযোগিতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, ডিজিটাল অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা, স্মার্ট গ্রিড, রোবোটিকস ও মহাকাশ প্রযুক্তির মতো খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এআইকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের বড় সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করে এর নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা, অন্তর্ভুক্তি ও গ্লোবাল সাউথের জন্য সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্রিকস প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু অর্থায়নের ঘাটতি, উচ্চ ঋণের চাপ এবং অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট ব্যবস্থার মতো আন্তর্জাতিক আইনবহির্ভূত একতরফা, শাস্তিমূলক ও বৈষম্যমূলক পদক্ষেপের বিরোধিতা করা হয়েছে।

খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাকেও ঘোষণায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ব্রিকস গ্রেইন এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষিতে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিভিন্ন উৎস থেকে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং স্থিতিশীল জ্বালানি বাজারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া দুর্নীতিবিরোধী সহযোগিতা, সন্ত্রাস দমন, আন্তঃসীমান্ত জালিয়াতি ও সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্র মোকাবিলা, অর্থ পাচার প্রতিরোধ এবং ডিজিটাল আর্থিক নিরাপত্তা জোরদারের অঙ্গীকার করা হয়েছে। ব্রিকস নেতারা সীমান্তপারের অপরাধ ও বড় ধরনের ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা, আর্থিক গোয়েন্দা, শুল্ক কর্তৃপক্ষ ও প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও জোর দেন।

নয়াদিল্লি ঘোষণায় বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি সহযোগিতার নতুন উদ্যোগের কথাও এসেছে। ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে গবেষণা অবকাঠামো, উদীয়মান প্রযুক্তি, কোয়ান্টাম গবেষণা এবং উচ্চগতির সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে ডিজিটাল সংযোগ জোরদারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ঘোষণার শেষাংশে ব্রিকসের সম্প্রসারণকে জোটটির প্রভাব, গ্রহণযোগ্যতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় ভূমিকার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ব্রিকস সভাপতিত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করায় ভারতকে ধন্যবাদ জানানো হয় এবং ২০২৭ সালে ব্রিকসের সভাপতিত্ব ও ১৯তম শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের জন্য চীনকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়া হয়। সূত্র: ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

Scroll to Top