প্রেম থেকে বিয়ে, অতঃপর ২ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকায় বিচ্ছেদ!

ঘটনাটি দক্ষিণ কোরিয়ার। দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অঙ্কের বিবাহবিচ্ছেদ নিষ্পত্তির রায় দিয়েছেন সেখানকার একটি আদালত। গেমিং ব্যবসায়ী ও ধনকুবের কওন হিউক-বিনকে তার সাবেক স্ত্রী লি হোয়া-জিনকে প্রায় ২ দশমিক ৫৫ ট্রিলিয়ন ওন বা ১৮৭ কোটি মার্কিন ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ লাখ ২৮ হাজার ১৪০ কোটি টাকা) সম্পদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কওন হিউক-বিন দক্ষিণ কোরিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম ভিডিও গেম কোম্পানি স্মাইলগেটের প্রতিষ্ঠাতা এবং দেশটির অন্যতম ধনী ব্যক্তি। ব্লুমবার্গের হিসাবে তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি ডলার।

আদালতের রায়ের ফলে কওনের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন স্মাইলগেটের ৩৫ শতাংশ শেয়ার তার সাবেক স্ত্রী লি হোয়া-জিনের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। এই শেয়ারের বর্তমান মূল্য প্রায় ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ওন।

এছাড়া তাকে আরও ৬ হাজার ৫০০ কোটি ওন নগদ অর্থ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আগের সব রেকর্ড ছাড়াল
এই রায়ের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় বিবাহবিচ্ছেদ মামলায় ক্ষতিপূরণের আগের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে।

এর আগে দেশটির সবচেয়ে বড় বিবাহবিচ্ছেদ নিষ্পত্তির রায় ছিল ৯৪৪ বিলিয়ন ওনের। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি ও শিল্পগোষ্ঠী এসকে গ্রুপের চেয়ারম্যান চে তাই-ওনকে তার সাবেক স্ত্রীকে ওই অর্থ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

তবে চলতি বছরের জুলাইয়ে দেওয়া সেই রায় পরে দক্ষিণ কোরিয়ার সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেয়। আদালত জানায়, দম্পতির সম্পদের মূল্য নির্ধারণে হিসাবগত ভুল হয়েছিল। মামলাটি পুনর্বিবেচনার জন্য নিম্ন আদালতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ কওন হিউক-বিনের মামলার রায়টি আগের রেকর্ডের দ্বিগুণেরও বেশি।

স্ত্রী চেয়েছিলেন কোম্পানির অর্ধেক মালিকানা
কওন হিউক-বিনের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করার সময় লি হোয়া-জিন স্মাইলগেটের ৫০ শতাংশ মালিকানা দাবি করেছিলেন। তার আইনজীবীদের দাবি ছিল, স্মাইলগেট প্রতিষ্ঠার সময় কোম্পানির প্রাথমিক অর্থায়নে লি ভূমিকা রেখেছিলেন।

কওন ও লি ২০০১ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এর এক বছর পর, ২০০২ সালে কওন স্মাইলগেট প্রতিষ্ঠা করেন।

লি হোয়া-জিনের দাবি, তিনি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তাদের সন্তানদের লালন-পালন এবং পরিবারের দেখভাল করেছেন। ফলে কোম্পানির সাফল্যের পেছনে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান রয়েছে।

অন্যদিকে কওন হিউক-বিন আদালতে দাবি করেন, তার সাবেক স্ত্রী কোম্পানিতে কোনও অর্থ বিনিয়োগ করেননি এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজও করেননি।

চলতি বছরের শুরুতে স্মাইলগেট এক বিবৃতিতে দাবি করেছিল, কোম্পানির প্রতিষ্ঠাকালীন পুরো মূলধনই কওন হিউক-বিনের কাছ থেকে এসেছিল।

স্মাইলগেট কী?
স্মাইলগেট দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম বৃহৎ ভিডিও গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। কোম্পানিটির সবচেয়ে জনপ্রিয় গেমগুলোর মধ্যে রয়েছে ফার্স্ট-পার্সন শুটার গেম ‘ক্রসফায়ার’ এবং অ্যাকশন রোল-প্লেয়িং গেম ‘লস্ট আর্ক’।

এতদিন স্মাইলগেটের পুরো মালিকানাই কওন হিউক-বিনের হাতে ছিল। তবে আদালতের সর্বশেষ রায়ের ফলে কোম্পানির মালিকানা কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, স্মাইলগেটের প্রায় ৩৫ শতাংশ মালিকানা লি হোয়া-জিনের কাছে চলে যাবে।

কোম্পানির মন্তব্যে নীরবতা
স্মাইলগেটের এক মুখপাত্র কোম্পানির প্রধান শেয়ারহোল্ডারের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যম চোসুন ডেইলির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, কোম্পানি স্বাভাবিক নিয়মেই নিজেদের দায়িত্ব ও কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।

তবে মামলাটি এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। দক্ষিণ কোরিয়ার আইনি ব্যবস্থায় উভয় পক্ষই আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ পাবেন।

ফলে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই বিবাহবিচ্ছেদ নিষ্পত্তির রায় চূড়ান্ত হতে এখনও আইনি প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় নজিরবিহীন রায়
দক্ষিণ কোরিয়ার করপোরেট ও আইনি অঙ্গনে এই রায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুল ব্যবসায়িক সম্পদ, দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন এবং প্রতিষ্ঠানের বিকাশে জীবনসঙ্গীর পরোক্ষ অবদানের প্রশ্নটি এই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

বিশেষ করে কোনও কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা বা প্রধান মালিকের ব্যক্তিগত সম্পদ এবং দাম্পত্য জীবনের সময়ে সেই সম্পদ বৃদ্ধিতে অপর পক্ষের ভূমিকা কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সে প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।

৩৫ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের নির্দেশ কার্যকর হলে লি হোয়া-জিন স্মাইলগেটের অন্যতম বড় শেয়ারহোল্ডারে পরিণত হবেন।

তবে কওন হিউক-বিন বা তার সাবেক স্ত্রী রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত এই বিবাহবিচ্ছেদ মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে আরও সময় লাগতে পারে। সূত্র: বিবিসি

Scroll to Top