জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ বলেছিলেন, ‘মার্কিন নাগরিকদের জীবন রক্ষার জন্য’ এবং নোরিয়েগাকে ‘বিচারের মুখোমুখি করার’ লক্ষ্যে পানামায় সামরিক বাহিনী পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এই ঘোষণাটি আসে পানামার নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে এক মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার কয়েক দিন পর। নোরিয়েগার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। এ অভিযোগে সে সময় নোরিয়েগার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছিল। একই সঙ্গে ১৯৮৯ সালে অনুষ্ঠিত পানামার নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগও উঠেছিল নোরিয়েগার বিরুদ্ধে । যুক্তরাষ্ট্র যে অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন জাস্ট কজ’, তাতে ২০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা পানামায় প্রবেশ করে এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়। সরকারি হিসাবে এই আগ্রাসনে পানামার সেনা ও বেসামরিক নাগরিক মিলিয়ে ৫১৪ জন নিহত হয়। তবে স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের দাবি, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা এক হাজারের কাছাকাছি। অভিযানে ২৩ জন মার্কিন সেনাও নিহত হয়। এই হামলার ফলে রাজধানী পানামা সিটি কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। নোরিয়েগা ভ্যাটিকানের কূটনৈতিক মিশনে আশ্রয় নেন। বড়দিনের সময়জুড়ে মার্কিন সেনারা দূতাবাসের বাইরে অবস্থান নেয় এবং তাকে বের করে আনতে দূতাবাসের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ বাড়াতে সেখানে উচ্চ শব্দে রক সংগীত বাজাতে থাকে। এই সংগীতের তালিকায় ছিল দ্য ক্ল্যাশ, ভ্যান হ্যালেন ও ইউটু ব্যান্ডের গান। সেসময় ১১ দিন দূতাবাসে অবস্থানের পর ১৯৯০ সালের তেসরা জানুয়ারি নোরিয়েগা আত্মসমর্পণ করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কর্মকর্তারা তাকে বিমানে করে মায়ামিতে নিয়ে যান। সেখানে বিচারে তাকে মাদক পাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। জীবনের বাকি সময়টুকু নোরিয়েগা কাটান কারাবন্দি অবস্থায়—প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রে, পরে ফ্রান্সে এবং শেষে পানামায় গৃহবন্দি হিসেবে। ২০১৭ সালে ৮৩ বছর বয়সে নোরিয়েগার মৃত্যু হয়। মস্তিষ্কের টিউমার অপসারণে অস্ত্রোপচারের জটিলতা তার মৃত্যুর কারণ বলে জানানো হয়।

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ থেকে বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নতুন করে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেছেন ভারতীয় কংগ্রেস নেতা শশী থারুর। তিনি বলেছেন, এই বিব্রতকর পরিস্থিতি ভারত নিজেরাই ডেকে এনেছে।

এক্সে দেওয়া এক পোস্টে শশী থারুর লেখেন, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। এই লজ্জা আমরা নিজেরাই ডেকে এনেছি।

মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক উল্লেখ করে শশী থারুর ইনডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, বাংলাদেশ পাকিস্তান নয়। বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসী পাঠাচ্ছে না। পরিস্থিতি মোটেও তুলনাযোগ্য নয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এক নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের যে পর্যায়ে রয়েছে ভারত, তা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের পর্যায় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই দুই দেশকে এক সরল সমীকরণে ফেলা যায় না।

এর আগে, ২০২৬ আইপিএলের নিলামে নয় কোটি বিশ লাখ রুপিতে মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে নেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স। এটি আইপিএলে কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারের জন্য রেকর্ড পারিশ্রমিক।

তবে গত কিছুদিন ধরে মোস্তাফিজের আইপিএলে খেলা নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে নানা বিতর্ক উঠে আসে। গত আঠারো ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনা এবং বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একটি অংশ এবং উগ্র ধর্মীয় সংগঠন মোস্তাফিজের আইপিএলে অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

এই প্রেক্ষাপটে হুমকির মুখে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সচিব দেবাজিৎ সাইকিয়া জানান, মোস্তাফিজকে বাদ দিতে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরে কলকাতা নাইট রাইডার্স আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাঁহাতি পেসারকে দল থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

২০২৬ টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ যৌথভাবে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের কথা রয়েছে। আগামী সাত ফেব্রুয়ারি কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হওয়ার কথা ছিল। গ্রুপ পর্বের আরও দুটি ম্যাচ একই মাঠে এবং শেষ ম্যাচ মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হওয়ার সূচি ছিল।

কিন্তু মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর সৃষ্ট উত্তেজনার মধ্যে বাংলাদেশ টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে দল না পাঠানোর ঘোষণা দেয়। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নিতে আইসিসিকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।

রবিবার বিসিবির এক বিবৃতিতে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয় দল টুর্নামেন্ট খেলতে ভারতে যাবে না। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণে সরকারের পরামর্শে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।

এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার করে ভারতের ক্রিকেট বোর্ড কলকাতা নাইট রাইডার্সকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তিনি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধের উদ্যোগ নিতে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টাকে অনুরোধ করার কথাও বলেন আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, বাংলাদেশ, বাংলাদেশের ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের অবমাননা কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া হবে না।

আরেক পোস্টে আসিফ নজরুল লেখেন, যেখানে চুক্তিবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটার ভারতে খেলতে পারেন না, সেখানে পুরো বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারে না।

মোস্তাফিজ ইস্যুর পর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এ বিষয়ে চুপ করে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই।

সেই বক্তব্যের ভিডিও শেয়ার করে শশী থারুর এক্সে আরেকটি পোস্টে লেখেন, শি ইজ রাইট অ্যালাস।

Scroll to Top