করোনাঃ ঈদবাজারে স্বাস্থ্যবিধি মানছে না কেউ

Eid bazer in Dhaka 2020

করোনা আতঙ্কে আতঙ্কিত গোটা বিশ্ব। মার্কেট খুলতেই একে একে আসা শুরু করেন ক্রেতারা। বাসার বড়দের সঙ্গে এসেছে ছোটরাও। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নির্দেশনায় এক এলাকার মানুষ অন্য এলাকায় ঈদ কেনাকাটায় যেতে পারবেন না, অথচ এ নিষেধ কেউ তোয়াক্কাই করছেন না। এভাবেই বাড়তে থাকে মার্কেটে উপচে পড়া ভিড়। গতকাল এ দৃশ্য দেখা যায় পুরান ঢাকার লালবাগ কেল্লার মোড় মার্কেটগুলোতে। শুধু রাজধানী আর পুরান ঢাকাতেই নয়, করোনা পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে শপিং মল ও মার্কেটগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই চলছে ঈদের কেনাকাটা। এতে করোনা সংক্রমণের হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

পুরান ঢাকায় পাইকারি ও খুচরা দোকান খুলেছে ১০ মে। এদিন থেকে রাস্তায় মানুষের চলাচল বেড়েছে। কোথাও কোথাও সেই আগের মতো যানজট তৈরি শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও পুরনো রূপে ফিরছে রাজধানী এবং পুরান ঢাকা। ঢাকাসহ সারা দেশে সীমিত পরিসরে দোকানপাট খোলার সুযোগ দেওয়ার অষ্টম দিনে গতকাল পুরান ঢাকার লালবাগ মোড় থেকে শুরু করে টিকাটুলী, ওয়ারী, নবাবপুর রোড, বংশাল, নাজিমউদ্দিন রোড, মৌলভীবাজার, চকবাজার, উর্দু রোড, ইসলামপুর, নিউমার্কেট এলাকা এবং এলিফ্যান্ট রোড ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। টিকাটুলী এবং ওয়ারীতে পোশাক, জুতা, ইলেকট্রনিকসহ অন্যান্য পণ্যের সব দোকান খুলেছে। নবাবপুর রোড এলাকায় বেশির ভাগ দোকানপাট

বন্ধ থাকলেও পণ্য ওঠানো-নামানো ও সরবরাহ করতে দেখা গেছে। নাজিমউদ্দিন রোডে আসবাব ও অন্যান্য দোকান খোলা ছিল। মৌলভীবাজারে নিত্যপণ্য ও অন্যান্য পণ্যের বেচাকেনা চলতে দেখা গেছে। চকবাজারে প্লাস্টিক, খেলনা, গয়না ইত্যাদি মনিহারি পণ্যের দোকান খুলেছে। উর্দু রোডে অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী পাইকারি পোশাকের দোকানে কেনাবেচা চলছে। ইসলামপুরে পাইকারি পোশাক ও বস্ত্রের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও বেচাকেনা করছে। আর লালবাগ কেল্লার মোড় মানুষের ভিড়ে যেন তিল ধারণের জায়গা নেই। নিউ সুপার মার্কেটসহ এলিফ্যান্ট রোডের শপিং মল খোলা ছিল। এমনকি এসব মার্কেটের সামনের ফুটপাথেও ভ্রাম্যমাণ দোকান বসেছে অনেক। বেচাবিক্রি চলছে বেশ। ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলির মধ্যে কেনাকাটা করতে দেখা গেছে ক্রেতাদের। সারি সারি দোকান আর মার্কেটের ভিতর গলিতে মাল রাখার কারণে হাঁটার সুযোগও নেই। ঠাসাঠাসি অবস্থার মধ্যেই চলছে ঈদের কেনাবেচা।

যেটা খুব বেশি দেখা যায়নি, সেটা হলো স্বাস্থ্য সুরক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। ছোট ছোট দোকানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন ছিল। প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে যারা পুরান ঢাকায় শাখা খুলেছে, তারা অন্যান্য এলাকার মতো সেখানেও একই সুরক্ষার ব্যবস্থা নিয়েছে। ওই সব দোকানে ঢোকার মুখে হাতে জীবাণুনাশক ছিটিয়ে দেওয়া, ব্লিচিং পাউডার গোলানো পানিতে জুতা পরিষ্কার করে প্রবেশ, তাপমাত্রা মাপা এবং মাস্ক পরার চিত্র দেখা গেছে। কিন্তু ছোট দোকান ও পাইকারি মার্কেটে এসব ব্যবস্থা দেখা যায়নি। কর্মী ও ক্রেতাদের গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে কেনাবেচা করতে দেখা গেছে। বেশির ভাগের মাস্ক ছিল, তবে থুঁতনিতে। আবার অনেকের তাও ছিল না। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা নানা সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া এবং তা মেনে চলার নির্দেশনা দিয়েছেন। এদিকে কেনাকাটার জন্য ওয়ারীতে সবচেয়ে ভালো জায়গা র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিট। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, সুপরিচিত ব্র্যান্ডের সব শাখাই খোলা রয়েছে। স্থানীয় পোশাক, জুতা, প্রসাধন ও অন্যান্য পণ্যের দোকান খোলা। রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ি, অটোরিকশা ও রিকশা চলছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক। তবে দোকানগুলোতে ক্রেতা ছিল স্বাভাবিক দিনের মতো।

কথা হয় নিউ সুপার মার্কেটের এক বিক্রেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, মার্কেট খোলার শুরুর দিকে একটু ভিড় কম ছিল। এখন আস্তে আস্তে বেচাবিক্রি বাড়ছে। ওয়ারীর ইসরাত ফ্যাশন নামে এক দোকানে বসে ছিলেন বিক্রেতা আমির হোসেন। এখানে ছিল না কোনো সুরক্ষার ব্যবস্থা। বললেন, বেচাকেনার অবস্থা মোটেও ভালো নয়। ওয়ারীর তুলনায় চকবাজার, উর্দু রোড ও ইসলামপুরে মানুষের চলাচল আর ভিড় অনেক বেশি দেখা গেছে। চকবাজারে যাওয়ার জন্য নাজিমউদ্দিন রোড দিয়ে ঢুকতে শুরুতেই যানজট। চকবাজার মোড়েও বেশ যানজট। নবাবপুর রোডের ইলেকট্রিক মার্কেটের একটি দোকানের কর্মী ইয়াসিন বলেন, বৈদ্যুতিক পণ্যের চাহিদা মোটামুটি ভালো।

খুচরা দোকান মালিকরা এখন ফোনে সরবরাহ আদেশ দিচ্ছেন। এখন পণ্য পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে দেশে ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি চলছে। দোকানপাট বন্ধই ছিল। ৪৫ দিন পর তা সীমিত পর্যায়ে (সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা) খুলে দেওয়া হয়। যদিও ঢাকার বড় বড় শপিং মল খোলেনি। এ ছাড়া গতকাল রাজধানীর শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, মিরপুর রোডের ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট, রামপুরা, বাড্ডা, প্রগতি সরণির মার্কেটগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় দেখা গেছে। সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার অনুমতি থাকলেও বেশির ভাগই খোলা ছিল সন্ধ্যা পর্যন্ত। এসব এলাকার বেশির ভাগ দোকানেই স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা যায়নি। রাজধানীর প্রগতি সরণির সুবাস্তু শপিং মলে প্রবেশে সকাল থেকেই দেখা যায় দীর্ঘ লাইন।

মানা হয়নি সামাজিক দূরত্ব ও যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি। গুলশান ১ নম্বরের ডিএনসিসি মার্কেটে উপেক্ষিত সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার নির্দেশনা। অসচেতন ক্রেতারা ঝুঁকি নিয়েই কেনাকাটা করছেন। বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাথেও বসেছে অস্থায়ী দোকান। সেখানের চিত্র আরও খারাপ। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা তো দূরের কথা, কারও কাছে নেই কোনো সুরক্ষার ব্যবস্থা। চানখাঁরপুল থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে কেনাকাটা করতে পুরান ঢাকার কেল্লার মোড়ে আসেন হাফিজুর রহমান।

ছেলেদের হাত ধরে এক দোকান থেকে আরেক দোকান ঘুরছিলেন। মাস্ক পরা থাকলেও তা ছিল থুঁতনি পর্যন্ত। জানতে চাইলে হাফিজুর বলেন, ‘প্রতিবেশীরা কেনাকাটা করেছে। তা দেখে বাচ্চারা কান্নাকাটি করছে। এজন্য এসেছি’। গত ৪ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আদেশে দোকানপাট খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, হাটবাজার, ব্যবসা কেন্দ্র ও দোকানপাট সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। প্রতিটি মার্কেটে প্রবেশের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানতে হবে।

তবে সরকারের এ সিদ্ধান্তের পর জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনা করে সবার আগে শপিং মল না খোলার ঘোষণা দেয় বসুন্ধরা সিটি শপিং মল কর্তৃপক্ষ। সরকারের আদেশ জারির পরদিন ৫ মে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপরিবার বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান ‘বসুন্ধরা শপিং মল’ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর সারা দেশের বড় বড় শপিং মল ও মার্কেট না খোলার ঘোষণা আসে।
:বাংলাদেশ প্রতিদিন