শহিদ, সাবরিনা, সাহেদ এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি

sohid, sahed and sabrina

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য শহিদ ইসলাম মানব পাচার ও অর্থ পাচারের মামলায় কুয়েতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। অন্যদিকে রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদ করিম সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন করোনা শনাক্তের পরীক্ষা করার জন্য। পরীক্ষা না করেই হাজার হাজার ভুয়া পজিটিভ বা নেগেটিভ সার্টিফিকেট দিয়েছে তাঁর হাসপাতাল।

একই কাজ করেছে জেকেজি হেলথ কেয়ার নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সাবরিনা একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, যিনি অন্তত ১৫ হাজার ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছেন। সাহেদ–সাবরিনাদের নেগেটিভ রিপোর্ট হাতে নিয়ে দেড় শতাধিক ইতালি অভিবাসী প্লেনে উঠেছিলেন। রোম বিমানবন্দরে পরীক্ষায় তাঁদের কারও কারও করোনা ধরা পড়ায় তাঁদের সবাইকে ফেরত পাঠানো হয়েছে, আর সেই সঙ্গে অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশিদের ইউরোপে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভুয়া রিপোর্টের বিষয়টি চাউর হয়েছে বিশ্ব মিডিয়ায়। এ দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে বাংলাদেশে।

একটি দেশের ভাবমূর্তি এক দিনে সৃষ্টি হয় না, এটা গড়ে ওঠে দীর্ঘ সময় ধরে সে দেশের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের নিরিখে। আর এ ভাবমূর্তি ধ্বংসও হয়ে যায় না এক দিনে বা একটি ঘটনায়। এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা বাংলাদেশে এই প্রথম ঘটেনি আর এই শেষ নয়। আমাদের দেখা দরকার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে, বিশেষত পশ্চিমা দুনিয়ার মানসপটে আমাদের ছবিটা কেমন। দুটো ইতিবাচক বিষয় আছে এ ছবিতে—এক. প্রবৃদ্ধির উচ্চ হার, দুই. বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয়দান। বাকি ছবিটা অনেকটাই অনুজ্জ্বল, গাদাগাদি লোকভর্তি একটা ছোট্ট দেশ, দারিদ্র্য, অপুষ্টি আর সেই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, নিম্নমানের লেখাপড়া বা দক্ষতা, বেআইনি অভিবাসন এবং মানব পাচারের উৎস, ব্যাপক দুর্নীতি আর অর্থ পাচার, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের অভাব এবং ভিন্নমত দমন—এই তো তাদের চোখে আমার বাংলাদেশ। এসব ঘটনার পর তাই ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন করে খুব বেশি বিচলিত হওয়ার কারণ দেখি না।

শহিদ, সাহেদ, সাবরিনা তাঁরা কেউ কিন্তু রোগ নন, তাঁরা রোগের উপসর্গ বা সিম্পটম মাত্র। মূল রোগ হচ্ছে দুর্নীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব। শহিদ তাঁর সংসদীয় আসন কার্যত কিনেছেন, পত্রপত্রিকায় এমন আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বিক্রিটা করল কে? তিনি জোটের অনুমোদিত জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এরপর সরকারি দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি থেকে তাঁর হয়ে কাজ করার জন্য স্থানীয় আওয়ামী লীগকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ নির্দেশটাও কি কেনা হয়েছিল? আর এরপর তাঁর স্ত্রী? সে পদটাই বা কে বিক্রি করল? শহিদ দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন আর তার কিয়দংশ দিয়ে জাতীয় সংসদের দুটি সদস্যপদ কিনেছেন। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে তিনি এত কিছু করতে পারতেন না।

দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসন খাতে বিবিধ অনিয়মই নিয়মে পরিণত বাংলাদেশে। জনশক্তি রপ্তানিতে নিয়োজিত অধিকাংশ ব্যবসায়ীর দেশে–বিদেশে অর্জিত বিপুল সম্পদের বড় অংশ সরকারি প্রশাসনযন্ত্রের সহায়তায় অনিয়ম–দুর্নীতির মাধ্যমেই অর্জিত। বিগত দশকে যখন সাধারণ শ্রমিক পাঠানোতে ১ হাজার ২০০ ডলারের (তখন এর সমান ৭২ হাজার টাকা) বেশি নেওয়া যাবে না বলে চুক্তি হয়েছিল, তখনো কোনো কর্মী তিন লাখ টাকার কমে চাকরি নিয়ে যেতে পারেননি। এ অনিয়ম চোখের সামনেই ঘটতে থেকেছে, কখনোই কোনো প্রতিকার হয়নি। অব্যাহত অনিয়ম এবং তা থেকে উদ্ভাবিত বিভিন্ন সমস্যার কারণে মালয়েশিয়া ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকারগুলো অনেক সময় বিরক্ত হয়ে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসন বন্ধ রেখেছে, যার সুবিধা ভোগ করেছে ভারত বা নেপাল। সাংসদ শহিদের কাণ্ড তাই পুরো নতুন কিছু নয়, এ ক্ষেত্রে এটি আরেকটি চরম উদাহরণ সৃষ্টি করল শুধু।

একইভাবে সাহেদ ও সাবরিনাদের জালিয়াতি আবিষ্কারের পর দেশের স্বাস্থ্য খাত কোন পর্যায়ে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত, তা জনগণ টের পেল। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, এ বিশাল খাতের ৯০ শতাংশ কেনাকাটা নাকি নিয়ন্ত্রণ করেন এক ব্যক্তি। অপ্রয়োজনীয় জিনিস অতি উচ্চ মূল্যে কেনা, কিছু সরবরাহ না করেই ভুয়া বিল দিয়ে অর্থ উত্তোলন এসবই নৈমিত্তিক ঘটনা। এ বিশাল আকারের দুর্নীতি অধিদপ্তরের ডিজি বা এ রকম চুনোপুঁটিরা নিয়ন্ত্রণ করেন আর ওপরের সবাই ধোয়া তুলসীপাতা, এ কথা কেউ বিশ্বাস করে না।

যুক্তরাজ্যের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) বিশ্বের দেশগুলোর গণতন্ত্র সূচক প্রকাশ করে। গণ–আন্দোলনে এরশাদ স্বৈরাচারের পতনের পর থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ছিল ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’ ধাপে। খুব খারাপ নয় এটা, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও একই দলে পড়ে, যদিও তাদের স্কোর ছিল বাংলাদেশের চেয়ে বেশ বেশি। ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশ এক ধাপ নেমে ‘হাইব্রিড রেজিম’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। হাইব্রিড রেজিমের সংজ্ঞা হলো যেসব দেশে নির্বাচনে নিয়মিত প্রতারণা হয়, যাতে তা অবাধ ও নিরপেক্ষ হতে পারে না, এ দেশগুলোর সরকার এমন, যেখানে বিরোধীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়, বিচার বিভাগ স্বাধীন নয়, দুর্নীতি সর্বব্যাপী, গণমাধ্যম চাপ ও হয়রানির শিকার এবং আইনের শাসন দুর্বল। ২০০৯ সালে আমরা নির্বাচিত সরকার পেলাম, কিন্তু হাইব্রিড রেজিমের তকমা রয়েই গেল অদ্যাবধি, ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রে উত্তরণও সম্ভব হলো না।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতির ধারণা সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থা তথৈবচ। সরকারের পক্ষ থেকে বেশ তৃপ্তির সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে তাদের পূর্বসূরিদের সময় দেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। খুবই সত্য কথা। তবে এত বছর পর আজও কিন্তু ১০০–তে ২৬ স্কোর নিয়ে আমরা ১৪৬ নম্বরে নাইজেরিয়ার সঙ্গে আর কেনিয়ার পেছনে। দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পর সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত বাংলাদেশ, এমনকি পাকিস্তানের চেয়েও।

কোনো পরিসংখ্যান পছন্দ না হলেই ষড়যন্ত্র খোঁজা আমাদের একটা অভ্যাস। তবে যাদের কাছে আমরা উজ্জ্বলতর ভাবমূর্তি দেখাতে চাই, তারা আমাদের ষড়যন্ত্র তত্ত্বে প্রভাবিত হয় না, তারা টিআই বা ইআইইউর পরিসংখ্যানকেই বিশ্বাস করে। ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে হলে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রতারণমুক্ত করতে হবে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, প্রবাসীদের প্রতারণা বা মানব পাচারে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে আর দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধানের ‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’ ধরনের ফাঁপা হুংকারে কাজ হবে না। ক্ষমতার সঙ্গে দুর্নীতির সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। ক্ষমতাহীন কেউ দুর্নীতি করতে পারে না। হাত দিতে হবে তাই ক্ষমতাশালী মহলে। কাজটা কঠিন, তবে বিশ্ব সম্প্রদায়ে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার কোনো সহজ পথ তো নেই।

মো. তৌহিদ হোসেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব
:প্রথম আলো