রহস্যে ঘেরা সাগর-রুনি হত্যাকান্ড, ৭৮ বার পেছালো প্রতিবেদন

Sagar-Runi

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজ বাসায় ২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নৃশংসভাবে খুন হন। ঘটনার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনা হবে। তবে ১০ বছরেও জানা গেল না সাংবাদিক দম্পতি সাগর রুনিকে কে বা কারা হত্যা করেছে। গোয়েন্দা পুলিশ ব্যর্থ হওয়ার পর এলিট ফোর্স র‌্যাব দায়িত্ব নিয়েও তদন্তে একচুল এগুতে পারেনি। মামলার তদন্ত প্রতিবেদনই দাখিলের জন্য এ পর্যন্ত সময় পিছিয়েছে ৭৮ বার।

আলোচিত এ হত্যা মামলায় রুনির বন্ধু তানভীর রহমানসহ মোট আসামি ৮ জন। আসামিরা হলেন- বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবির, রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মিন্টু ওরফে বারগিরা মিন্টু ওরফে মাসুম মিন্টু, কামরুল হাসান অরুণ, পলাশ রুদ্র পাল ও আবু সাঈদ। আসামিদের প্রত্যেককে একাধিকবার রিমান্ডে নেওয়া হলেও তাদের কেউই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়নি। নিহত রুনির ভাই নওশের আলী রোমান বলেন, তদন্তকারী সংস্থার এ ধরনের আচরণই তো বলে দিচ্ছে, বিচার তো পরের কথা এ তদন্তের রহস্য উন্মোচনের কোন আশা আমরা দেখিনা। তদন্তকারী সংস্থার অদক্ষতা বা অজানা কোন চাপে তারা তা উন্মোচন করতে চাচ্ছেনা। যে কারণে বিচার পাওয়ার আশা আমাদের কাছে অনেক দূরে মনে হয়।

খুনি গ্রেপ্তার এবং বিচারের আশা ছাড়ছেন না সাগর-রুনির স্বজনরা। সাগর সারোয়ারের মা সালেহা মনির বলেন, ‘৩০ বছর পর যদি সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলার বিচার শুরু হতে পারে, তবে আমাদের সন্তান হত্যার বিচার কেন হবে না। একদিন না একদিন বিচার হবেই। হয়তো আমি দেখে যাব, না হয় দেখে যেতে পারব না।’ তিনি বলেন, ‘তদন্ত সংস্থার সদিচ্ছা দরকার। আর আদালতকে ভূমিকা নিতে হবে। তারা (আদালত) তদন্তের জন্য একটি সময় বেঁধে দিতে পারেন। যদি আমার সন্তানরা রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে থাকে তদন্ত করে দেখাক, আমি বিচার চাইব না। মামলায় যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তারা হতে পারে অন্য কোনো ক্ষেত্রে অপরাধী, তবে এ ঘটনায় নয়। তাই প্রকৃত আসামি গ্রেপ্তার এবং বিচারের আশায় আছেন বলে জানান তিনি।

প্রথমে সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তের দায়িত্বে ছিল মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের। তারা ব্যর্থ হওয়ায় ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার দেয়া হয় র‌্যাবকে। কিন্তু নয় বছরেও মামলার তারা তদন্তকাজে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। এরমধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে পাঁচবার। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা বিভিন্ন পন্থায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরামর্শে সকল ধরনের তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তদন্তাধীন বিষয়ে খুব বেশ কিছু বলাটা সমাচীন হবে না। র‌্যাব সকলকে আশ্বস্ত করতে চায়। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মামলাটি চলমান রয়েছে।

তদন্ত শেষ করতে না পারায় প্রশ্নতো উঠবেই, বলছেন খোদ রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু। তিনি জানান, দীর্ঘদিন হলো এটার তদন্ত শেষ হচ্ছেনা। এটা একটা প্রশ্ন, জনমনেও প্রশ্ন। আমি বলতে চাই যে, অতি দ্রুত এ মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। গেল তেসরা ফেব্রুয়ারি চাঞ্চল্যকর এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে ৭৮ বারের মতো সময় নিয়েছে র‍্যাব। আগামী ১১ মার্চ পরবর্তী তারিখ ঠিক করে দিয়েছে আদালত। সেদিন আদালতে হাজির করার মতো নতুন কোন তথ্য এখন পর্যন্ত নেই র‌্যাবের কাছে।

প্রসঙ্গত, এর আগে ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যৈষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। রুনির ভাই নওশের আলম শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। আসামি করা হয় রুনির কথিত বন্ধু তানভীর রহমানসহ ৮ জনকে। এদের মধ্যে তানভীরসহ দু’জন জামিনে আছেন। বাকিরা কারাগারে।