ঘরে না থাকলে ইতালির চেয়েও ভয়ংকর হবে বাংলাদেশের অবস্থা

ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই মুহূর্তে কেউই নিরাপদ নয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবাই নিজ উদ্যোগে ঘরে না থাকলে যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন ও ইতালির চেয়ে ভয়ঙ্কর অবস্থা হবে বাংলাদেশে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন।

প্রাণঘাতি করোনাভাইরাসে শনিবার বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৯ জন। ঠিক ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে গতকাল ১৮ জন আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গেছে এক জন। দ্বিগুণ হয়ে করোনার আক্রান্তের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৮ জন। আর মৃতের সংখ্যা বেড়ে হলো ৯ জন।

এদিকে করোনার ঝুঁকি ঢাকায় সবচেয়ে বেশি। আক্রান্ত ৮৮ জনের মধ্যে ৫৪ জনই ঢাকার, বাকিরা ১০ জেলার বাসিন্দা। ঢাকার মধ্যে মিরপুর, টোলারবাগ ও বাসাবো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এ অবস্থায় ঢাকা থেকে যাতে কোনো লোক বাইরে যেতে না পারে এবং ঢাকার বাইরে থেকে কোনো মানুষ যাতে ঢাকায় আসতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশের সব ইউনিটকে নির্দেশনা দিয়েছেন আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। গতকাল রবিবার তিনি এই নির্দেশনা দেন। আইজিপির এই নির্দেশে ঢাকা লকডাউনের কথা উল্লেখ না করা হলেও কার্যত ‘লকডাউন’ হলো ঢাকা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখ্য চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে অ্যাকশন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। প্রয়োজনে কারফিউ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, কেউই নিরাপদ নই। তাই সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। সামাজিক দূরত্ব সবাই যদি না মানি, তবে স্বাস্থ্য বিভাগ একা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। ঘরে থাকতে হবে। তা না মানলে পরিস্থিতি আমেরিকার ও ইতালির চেয়ে ভয়াবহ হবে।

গতকাল দুপুরে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত ব্রিফিং অনলাইনে করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, যিনি মারা গেছেন তিনি ৫৫ বছর বয়সি এক জন পুরুষ, বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছে বাংলাদেশও সেই পথ অনুসরণ করছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা কিন্তু অনেক কিছু শিখি, চীন, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর থেকে। তারা কিন্তু এটা কন্ট্রোল করেছে টেস্টিংয়ের মাধ্যমে, আইসোলেশনের মাধ্যমে, মুখে মাস্ক পরে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে। আমাদের সেখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

এদিকে আক্রান্ত ও মৃত ব্যক্তির বিস্তারিত তুলে ধরে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৬৭টি নমুনা পরীক্ষা করে ১৮ জনের মধ্যে ভাইরাসের উপস্থিতি মিলেছে। এর মধ্যে আইইডিসিআরে ১৩ জন এবং অন্যান্য হাসপাতালে পাঁচ জন শনাক্ত হয়েছে। মোট ১৪টি ল্যাবে পরীক্ষা চলছে। দেশে গত ৮ মার্চ প্রথমবারের মতো করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার পর এটাই ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হওয়া নতুন রোগীর সর্বোচ্চ সংখ্যা। নতুন আক্রান্তদের ১৫ জন পুরুষ, তিন জন নারী। এর মধ্যে ১২ জন ঢাকার, পাঁচ জন নারায়ণগঞ্জের এবং এক জন মাদারীপুরের। আক্রান্তদের বয়স ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে এক জন, ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে দুই জন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে পাঁচ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ৯ জন এবং ষাটোর্ধ্ব বয়সি আছেন দুজন। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা প্রসঙ্গে আইইডিসিআর পরিচালক জানান, নারায়ণগঞ্জে ১১ জন, বাসাবোতে ৯ জন, টোলারবাগে ছয় জন ও মিরপুরে ১১ জন। আক্রান্ত ব্যক্তিরা ওই ক্লাস্টার (যেখানে একসঙ্গে অনেকে সংক্রমিত হয়েছেন) ভিত্তিক এলাকার বাসিন্দা। আক্রান্তদের মধ্যে আরো তিন জন সুস্থ হয়ে ওঠায় এ পর্যন্ত মোট ৩৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। এখন আক্রান্ত ৪৬ জন রোগী চিকিত্সাধীন আছেন।

আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় রোগী পাওয়া যাচ্ছে, এ কারণে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়েছে বলা যায়। তবে তা ক্লাস্টার ভিত্তিতে আছে। তিনি বলেন, এখনো বলছি, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে, জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে। এটা যদি না করি তাহলে সংক্রমণ কিন্তু ক্লাস্টার থেকে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে। সুতরাং সবাইকে অনুরোধ করছি সব ধরনের জনসমাগম এড়িয়ে চলুন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, এখন পর্যন্ত ৬৫ হাজার ৮০২ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইন, ২৬৭ জনকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছে। এর মধ্য গত ২৪ ঘণ্টায় হোম কোয়ারেন্টাইনে গেছেন ১ হাজার ১১১ জন, প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে গেছেন ৯ জন। এ পর্যন্ত ৫৩ হাজার ৪১২ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে; ফলে এখন কোয়ারেন্টাইনে আছেন ১২ হাজার ৬৫৯ জন। এখন পর্যন্ত মোট ৫২০ জনকে আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছে।