ফিরে গেলেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং

Sheikh Hasina-Lotay Tshering

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর তিন দিনের সফর শেষে ঢাকা ছেড়েছেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং।

আজ বৃহস্পতিবার (২৫ মার্চ) সকাল ১০টা ১০ মিনিটে তিনি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নিজ দেশের উদ্দেশে রওনা হন। এ সময় লোটে শেরিংকে বিদায় জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন।

এর আগে এর আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজনে যোগ দিতে তিন দিনের সফরে মঙ্গলবার (২৩ মার্চ) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হযরত শাহজালাল (রহ.) বিমানবন্দরে পৌঁছান ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং।

সে সময় রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় তাকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে ২১টি গান স্যালুটসহ গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতিবেশী দেশ ভুটান সবার আগে স্বীকৃতি জানিয়েছিল। ১৯৭১ এ যে বন্ধুত্ব স্থাপন হয়েছিল দুই দেশের মধ্যে পরবর্তী ৫০ বছরে তা আরও মজবুত হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে ঢাকা সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একান্ত বৈঠকে বন্ধুত্বের সেই বার্তাই দিয়েছেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং।

হাসিনা-শেরিং একান্ত বৈঠক নিয়ে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবদুল মোমেন বলেন, করোনা মহামারির মধ্যেও ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিংয়ের সফর দুই দেশের মধ্যে অসাধারণ বন্ধুত্বের পরিচয় বহন করে। পারস্পরিক সম্মান, রাজনৈতিক সমঝোতা ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এবং উভয় দেশের জনগণের সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে অত্যন্ত চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ ও ভালো প্রতিবেশীসুলভ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বিদ্যমান। অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে পরীক্ষিত বন্ধুত্বের প্রতিফলন ঘটেছে।

বৈঠকে দুই দেশের ঐতিহাসিক ও ভালো প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় গভীর বলে উভয় প্রধানমন্ত্রী একমত হয়েছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভুটানের তৃতীয় রাজা জিনমে দর্জি ওয়াংচুক এবং সেদেশের জনগণের অমূল্য সমর্থনের বিষয়টি অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সময় স্মরণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতিকারী দেশ হিসেবে এবং একই ধরনের ঐতিহ্য ও বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের কারণে ভুটান বাংলাদেশের জনগণের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উভয় নেতা দু’দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সার্বিক দিক পর্যালোচনা করেন। উভয় দেশের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রের বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। বৈঠকে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে ছিলো বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সড়ক রেল ও বিমান যোগাযোগ, জলবিদ্যুৎ-দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় উভয়ই, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, সংস্কৃতি এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি।

বৈঠকে করোনা মহামারি মোকাবিলায় ওষুধ পাঠানোয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি ভুটানের প্রধানমন্ত্রী এ সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ফরেন অফিস কনসালটেশন এবং বাণিজ্য সচিব পর্যায়ে বৈঠক যত দ্রুত সম্ভব অনুষ্ঠানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আন্তঃরাষ্ট্রীয় পানিপথ ব্যবহারের জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর এবং ট্রানজিট চুক্তির খসড়া প্রটোকল চূড়ান্ত করার বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করেন দুই সরকারপ্রধান।

বৈঠকে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ব্যান্ড উইথ ব্যবহারে ভুটান আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থা কাজ করছে। এ ছাড়া ভুটানের অনুরোধে বাংলাদেশ এই ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথটা কম দামে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী মূল্যে তাদের এটা দেয়া হবে- বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

বৈঠকে বাংলাদেশ-ভুটান এবং ভারতের মধ্যে জলবিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী একযোগে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দরে ভুটানের প্রবেশাধিকার প্রদানে বাংলাদেশের সম্মতির বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এ বিষয়ে ট্রানজিট চুক্তি ও প্রটোকল দ্রুত সম্পাদনের ওপর তিনি জোর দিয়েছেন।

ভারতের চিলাহাটি ও হলদিবাড়ী ট্রেন সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ভুটানের মধ্যে ট্রেন যোগাযোগ স্থাপনের বিষয়টি খতিয়ে দেখার বিষয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী সম্মত হয়েছেন।

ভুটানের গেলোফু ও বাংলাদেশের সাথে বিশেষ করে লালমনিরহাট ও সৈয়দপুরের সঙ্গে কার্গো বিমান যোগাযোগ স্থাপনের সম্ভবনার বিষয়েও খতিয়ে দেখার বিষয়েও দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী সম্মত হয়েছেন।

বৈঠকে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেন যে ১৯ জন বাংলাদেশি ডাক্তার ও সার্জন ভুটানে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন এবং বাংলাদেশ থেকে আরও ডাক্তার ভুটানে প্রেরণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ।

এ ছাড়া ভুটানের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য ক্রমবর্ধমানভাবে বাংলাদেশকে পছন্দ করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্তোষ প্রকাশ করেন। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী উভয়ই বাংলাদেশ থেকে মেডিকেল পাস করে তাদের দেশে ফিরে গেছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভুটানের অনুরোধে তাদের যে শিক্ষার্থীরা আমাদের দেশে আসেন, তাদের কয়দিন পরে পরে ভিসার নবায়ন করতে হয়, আমরা রাজি হয়েছি তাদেরকে ৫ বছরের জন্য ভিসা দিতে।

বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে বন্ধুত্বের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যৌথভাবে সম্পাদনের বিষয়ে উভয় প্রধানমন্ত্রী একমত হয়েছেন।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভুটানের কৃষিবিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ প্রদানে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আলোচনা খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে আরও জানান, বৈঠকে ভুটান বাংলাদেশকে সে দেশের বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করার ও সেখান থেকে হাইড্রোলিক গ্রিন এনার্জি সরাসরি বাংলাদেশে আনার প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশের কাছেও যা আর্কষণীয় মনে হয়েছে।