বিএনপির ২৮ পাতার বাজেট ভাবনা

Mirza Fakhrul Islam Alamgir

আজ বৃহস্পতিবার (৩ জুন) জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ইতোমধ্যে সংসদের বাইরে থাকা দেশের বড় বিরোধীদল বিএনপি গত ২৮ মে তাদের বাজেট ভাবনা তুলে ধরেছে।

ওই দিন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ সম্মেলন করে ২৮ পাতার একটি বাজেট ভাবনা তুলে ধরেন।

তিনি লিখিত ওই বাজেট ভাবনায় বলেন, এবারের বাজেট হওয়া উচিৎ জীবন বাঁচানোর বাজেট। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি মোকাবেলার বাজেট। জীবন ও জীবিকার সমন্বয়ের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে, তবে জীবন সবার আগে।

দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এবারের বাজেট হবে করোনা ভাইরাসের নিয়ন্ত্রণ ও অভিঘাত থেকে উত্তরণের বাজেট। আগামীতে বাংলাদেশকে একটি কাঙ্খিত অর্থনৈতিক শক্তি ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সমন্বিত, অংশীদারিত্বমূলক, অন্তর্ভুক্তিমুলক, অর্থনীতি এবং ’সুশাসন ও রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে জবাবদিহিতা’ নিশ্চিতকরণের নীতি বাজেটের লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে।

প্রবৃদ্ধির দিকে নজর না দিয়ে সমতাভিত্তিক উন্নয়ন ও করোনার অভিঘাত মোকাবেলায় মানুষের আয়-বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে বাজেটের সিংহভাগ অর্থ ব্যয় করতে হবে। উন্নয়ন বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করে স্থানীয় জনপদ তথা তৃণমূল ও মধ্যম শ্রেণির উন্নয়নে মনোনিবেশ করতে হবে। উন্নয়নের মূলমন্ত্র হবে জনগণের দ্বারা উন্নয়ন এবং জনগণের জন্য উন্নয়ন। বাজেটের লক্ষ্য হবে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন।

বাজেটে অর্থ বরাদ্দে অগ্রাধিকার ও অর্থ সংকুলান সংক্রান্ত প্রস্তাব দিয়ে বিএনপির মহাসচিব বলেন, স্বাস্থ্য খাতকে বাজেটের সর্বাধিক তালিকায় রাখতে হবে। চলমান বৈশ্বিক মহামারি প্রতিরোধ ও করোনা চিকিৎসা দুটিই সমানতালে চালিয়ে যাওয়ার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫% ব্যয় করতে হবে। প্রত্যেক জেলায় ডেডিকেটেড সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

করোনাকালে জেলা হাসপাতালগুলোতে করোনা বেড ও আইসিইউ সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে এবং তা উপজেলা হাসপাতাল পর্যায়ে সম্প্রসারণ করতে হবে।

বিএনপি মনে করে, করোনা ভাইরাসের মন্দার সময় বিশ্বের অনেক দেশ তাদের জিডিপির ৫০ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বাস্থ্যগত, আর্থিক বা খাদ্যসহায়তা দিয়ে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকার।

আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, মহামারি মোকাবেলায় বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ব্যয় করেছে জিডিপর মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ। যার পরিমাণ ৪৬০ কোটি ডলার। এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় মাত্র ৪০ কোটি ডলার। অন্যদিকে, প্রতিবেশী ভারতের ব্যয় জিডিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং পাকিস্তান এখন পর্যন্ত ব্যয় করেছে জিডিপির ২ শতাংশ।

মির্জা ফখরুল বলেন, লকডাউনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দিন আনে দিন খায়- শ্রেণির গরিব দিনমজুর, পেশাজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষদের প্রত্যেককে এ পর্যায়ে অনতিবিলম্বে রাষ্ট্রীয় বিশেষ তহবিল থেকে বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ৩ মাসের জন্য ১৫ হাজার টাকা এককালীন নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতির আলোকে প্রয়োজনে এ বরাদ্দ নবায়ন করতে হবে।

তিনি বলেন, কোভিডকালে কয়েক লক্ষ প্রবাসী দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ঋণ প্রণোদনা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। সকল ধরনের নতুন উদ্যোক্তাদের ৫% বছর কর-ছাড় দিতে হবে।

কৃষি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, লাভজনক বাণিজ্যিক কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষি ও গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে গ্রামীণ আয়-রোজগার বাড়াতে হবে। সহজ শর্তে ব্যাপকভাবে কৃষি, পোল্ট্রি, ফিসারিজ ও লাইভস্টক ঋণ প্রদান করতে হবে। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি নিশ্চিত করতে হবে। একটি কৃষি কমিশন গঠন করতে হবে।

তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি খাতে সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে হবে। বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে। বাজারে নগদ অর্থ-প্রবাহ নিশ্চিত করতে সক্রিয় মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হবে। মুদ্রানীতিকে স্থিতিশীলকরণ ও উন্নয়নমুখী- দুটো দায়িত্ব পালন করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঐতিহ্যগত অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে।

রাষ্ট্রের অর্থ জনগণেরই অর্থ উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, জনগণের অর্থ যাতে মুষ্টিমেয়র হাতে না যায়। প্রণোদনা কেবল প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদেরকেই দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখা দরকার, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান জরুরি; কিন্তু কর্মসংস্থানই মূল নিয়ামক।

শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ে একটি অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করতে হবে। নীতিনির্ধারণী বিষয় আলোচনার এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াটা বর্তমানে অনুপস্থিত। বর্তমানে বিচ্ছিন্নভাবে কাজভিত্তিক কিছু কমিটি হয়। কিন্তু সার্বিকভাবে অর্থনীতি পরিচালনা করার জন্য টেকনিক্যাল জ্ঞানের যে তর্কবিতর্ক ও আলাপের দরকার হয়, সেই প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াটি অনুপস্থিত।

অর্থ সংকুলানের উপায় বাতলে দিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, বাজেট ঘাটতি ও জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত সহনীয় কোটায় সীমিত রাখতে হবে। মন্দায় ভোক্তার ব্যয় ও উৎপাদনের দুরবস্থায় মূল্যস্ফীতির সম্ভাবনা কম থাকলেও মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি কঠোর মনিটরিং করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে। সহজে কর আদায়ের খাতগুলো বাড়াতে হবে। যেমন, এ দেশে কর্মরত অনিবন্ধিত প্রায় আড়াই লাখ বিদেশি নাগরিকের কাছ থেকে ওয়ার্ক পারমিট ও আয়কর বাবদ প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার আয়কর আদায় করা যায়। ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল সক্রিয় করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো থেকে কর বৃদ্ধি করতে হবে। যে সকল দেশি কোম্পানিকে গোষ্ঠীতান্ত্রিক কর-সুবিধা দেওয়া হয়, তা পুনঃনিরীক্ষণ করতে হবে। কর ভিত্তি সম্প্রসারণ করতে হবে।

দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উৎস থেকে বিদেশি অনুদান বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ব্যাংক খাত থেকে আর ঋণ নেওয়া যাবে না। কারণ এতে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের লক্ষ্যে ঋণ প্রাপ্যতা হ্রাস পাবে।

ট্রেজারি বিল ও সঞ্চয়পত্রে ঋণ পরিশোধ ব্যয় বাড়াবে। বাংলাদেশ ব্যাংককেই সরকারের অর্থের জোগান দিতে হবে। বাণিজ্যপ্রবাহে বিঘ্নতা এড়াতে বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা দরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা অদলবদল বা কারেন্সি সোয়াপ, বার্টার ব্যবস্থা চালুর পদক্ষেপ এবং পুঁজির বহির্গমন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে বা তারল্য জোগানের মাধ্যমে এ মহাসংকট থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন সক্রিয় রাজস্ব নীতির।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, বাজেট শুধুমাত্র সরকারের অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয়ের বিষয় নয়। বাজেটে কত আয় ও কত ব্যয় করা হলো তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক নীতি। মূলত আর্থিক নীতি নির্ভর করে একটি সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। সে পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির বছরে আমরা আগামীর বাংলাদেশকে কোন অর্থনীতির নীতির আলোকে দেখতে চাই, সেটা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ আমরা যদি আমাদের সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক নীতি ঘোষণা করতে না পারি তবে দেশের সার্বিক আর্থিক খাত দিশাহীন হয়ে পড়বে। বিএনপি এবারের বাজেটকে কেবলমাত্র নির্দিষ্ট অর্থবছরের হিসাবের চেয়ে আগামী দিনের অর্থনীতির সুনির্দিষ্ট পদনির্দেশের যাত্রাবিন্দু হিসেবে দেখতে চায়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির বছরে এই বাজেট-ভাবনা উপস্থাপনের প্রাক্কালে আমরা সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই যে আগামী দিনে একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী, সামাজিক নিরাপত্তাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে সকল প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের মাধ্যমে একটি কার্যকরী নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমাদের তাই ‘সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ অর্থনীতি’ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতেই
হবে।