এবার ডিম খাওয়ায় আন্তর্জাতিক মানে বাংলাদেশ

ডিম প্রোটিনে ভরপুর একটি খাবার। অনেকে যদিও ডিম নিয়ে বিভিন্ন চিন্তায় পড়ে থাকে। তবুও ডিম অত্যন্ত কম দামের পুষ্টিকর খাবার হিসেবে পরিচিত। সহজলভ্য পুষ্টির উত্স হিসেবে ডিমের তুলনা কেবল ডিমই হতে পারে।

এক যুগ আগেও সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের মানুষ বছরে গড়ে ৪০টির বেশি ডিম খেতে পারত না। সেই দিন অবশ্য এখন বদলে গেছে। ধনী–গরিবনির্বিশেষে যে খাবার সবার খাদ্যতালিকায় থাকে, সেটি হচ্ছে ডিম। এখন বছরে এখানকার মানুষ গড়ে ১০৩টি করে ডিম খাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ন্যূনতম চাহিদার সমান। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, একজন মানুষের ন্যূনতম পুষ্টি চাহিদা পূরণে খাদ্যতালিকায় বছরে ১০৪টি ডিম থাকা দরকার।

গত এক যুগে দেশে ডিমের উৎপাদন তিন গুণ বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে নিয়ে আসতে অবশ্য দেশের পোলট্রি খাতকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। কয়েক বছর পরপর বার্ড ফ্লু রোগের আক্রমণে একের পর এক খামার বন্ধ হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। বাজারে নকল ডিম পাওয়া যাচ্ছে বলে নানা গুজবও ডালপালা মেলেছে। এখন গবেষণা বলছে, আসলে নকল ডিম বলে কিছু নেই। এসবের মধ্য দিয়ে দেশের পোলট্রি খাত এক যুগ ধরে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে।

গত জুনে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সএ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে যেসব ডিম নকল হিসেবে প্রচার করা হতো, তা আসলে প্রাকৃতিক নিয়মে কিছু অস্বাভাবিক আকৃতি ও রঙের। গবেষণাটি করেছেন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের তিনজন গবেষক। তাঁদের গবেষণায় বলা হয়, দেশে উৎপাদিত ডিমের ২ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ কিছুটা অস্বাভাবিক হয়ে থাকে। এসব অস্বাভাবিক ডিম বাজারে এলে সেগুলোকে চীনের তৈরি কৃত্রিম বা নকল ডিম হিসেবে এত দিন প্রচার করা হয়েছে। আদতে এসব ডিম আর দশটা ডিমের মতোই পুষ্টিমানসমৃদ্ধ। আকৃতি ও রঙের ক্ষেত্রে অন্য ডিমের চেয়ে দেখতে আলাদা হওয়ার কারণে এসব ডিম নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

মূলত গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কোথাও নকল ডিম পাওয়া গেছে—এমন সংবাদ প্রকাশের পর গবেষকেরা সেখানে গিয়ে ডিমগুলো সংগ্রহ করেছেন। তাঁরা দেশের ২৫টি জেলা থেকে এমন ৩ হাজার ৬৬০টি ডিমের নমুনা সংগ্রহ করে তা গবেষণাগারে পরীক্ষা করেন।

গবেষণায় যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক নথুরাম সরকার, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শাকিলা ফারুক ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আতাউল গণি রব্বানী। ২০১৭ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত তাঁরা গবেষণাটি করেন। সীমান্ত স্থলবন্দর, বিভাগীয় শহর, জেলা-উপজেলার বিভিন্ন ছোট-বড় বাজারসহ ঢাকার বিভিন্ন পোলট্রি মার্কেট থেকে তাঁরা ডিমের নমুনাগুলো সংগ্রহ করেন। নমুনাগুলোর সঙ্গে ইনস্টিটিউটের পোলট্রি গবেষণা খামারের ডিমেরও তুলনা করা হয়। তাতে কোনো ধরনের অসামঞ্জস্য পাওয়া যায়নি।

এ ব্যাপারে নথুরাম সরকার বলেন, ‘যেসব ডিমকে নকল হিসেবে প্রচার করা হয়েছে, সেগুলো পরীক্ষা করে আমরা অন্য স্বাভাবিক ডিমের মতো একই পুষ্টিমান পেয়েছি। শুধু দেখতে ভিন্ন হওয়ার কারণে এগুলোর বিষয়ে একদল মানুষ অপপ্রচার চালিয়েছে। হয়তো ভুল বুঝে বা কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এই অপপ্রচার হতে পারে।’

 

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে ডিমের উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৯৯ কোটি ৫২ লাখ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১ হাজার ৭৮১ কোটি ডিম উৎপাদিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রায় ৮ হাজার ৩৩৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকার ডিমকেন্দ্রিক বাণিজ্য হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ নাগাদ প্রায় ১২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকার ডিমবাণিজ্য হতে পারে।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশ ডিম উৎপাদনে আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এখন আমাদের সামনের দিনের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আরও পুষ্টিমানসমৃদ্ধ ডিম উৎপাদন করা।’
ঃ প্রথম আলো

Scroll to Top