যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দফার সামরিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি এবার অঞ্চলটির আরও গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস রফতানি বাণিজ্যপথ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান।
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তার ‘আগ্রাসী কর্মকাণ্ড’ বন্ধ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য জ্বালানি রফতানি রুটও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বুধবার ভোরে তারা ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় নতুন করে ড্রোন, যুদ্ধবিমান ও নৌবাহিনীর সমন্বিত হামলা চালিয়েছে। এর আগে রাতভর প্রায় সাত ঘণ্টাব্যাপী আরেকটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে বাড়ছে বৈশ্বিক উদ্বেগ
সাম্প্রতিক কয়েক দিনের সংঘাত হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্বকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবাহিত হয়।
সংঘাতের জেরে প্রণালীতে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে; অপরিশোধিত তেলের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
নতুন করে হামলা যুক্তরাষ্ট্রের
সেন্টকমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বুধবারের হামলায় ইরানের এমন সামরিক সক্ষমতা লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়েছে, যা হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, প্রায় ৯০ মিনিটব্যাপী অভিযানে ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের গুদাম এবং গ্রেটার তুনব দ্বীপে অবস্থিত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোতে নির্ভুল হামলা চালানো হয়েছে।
ওয়াশিংটনের ভাষ্য, এসব হামলার ফলে বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত হানার ইরানের সক্ষমতা আরও দুর্বল হয়েছে।
ট্রাম্পের নতুন হুমকি
এর আগে মঙ্গলবার রাতে সম্প্রচারিত এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরান আলোচনায় ফিরে না এলে আগামী সপ্তাহে দেশটির সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালানো হবে।
ট্রাম্প বলেন, “জ্বালানি খাতকে আপাতত শেষের জন্য রেখে দিচ্ছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা জ্বালানি স্থাপনাগুলোতেও আঘাত হানব।”
এর আগে এপ্রিল মাসেও ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। সে সময় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক এ ধরনের বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল।
আবারও অবরোধে ইরানের বন্দর
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নতুন করে অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশ কিংবা সেখান থেকে বের হতে পারছে না।
গত মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবে এই অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়েছিল। ওই সমঝোতার উদ্দেশ্য ছিল কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটানো।
তবে হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন বিরোধ দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি আবারও জটিল হয়ে উঠেছে।
পাল্টা হুঁশিয়ারি আইআরজিসির
মার্কিন অবরোধ পুনর্বহালের পর আইআরজিসি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছে, ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য তেল ও গ্যাস রফতানি পথও বন্ধ হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
তবে কোন কোন রুটকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি তারা।
জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার দাবি
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দাবি করেছে, দেশটির সেনাবাহিনী পৃথক অভিযানে জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এসব আঞ্চলিক মিত্র জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে এবং সেগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেনি।
বাড়ছে আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা এবং হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
দুই পক্ষের কেউই আপাতত অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত না দেওয়ায় সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও সরাসরি এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। সূত্র: বিবিসি







