ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির পেছনে নির্দিষ্ট কাঠামোগত ‘মহা কৌশল’ (ডকট্রিন) খুঁজে ফেরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের দেড় বছরের মাথায় এসেও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংবাদমাধ্যমের কলামিস্টরা ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ, ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় সুনির্দিষ্ট বিমান হামলা, ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির চাপ এবং ইউক্রেন সংকট নিয়ে কূটনৈতিক দৌড়ঝাপের মধ্য দিয়ে একটি সুসংহত পররাষ্ট্রনীতি দাঁড় করানোর মরিয়া কসরত চালাচ্ছেন।
তবে প্রখ্যাত রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকার লিও হাদারের মতে, এই অন্বেষণ মূলত একধরনের পণ্ডশ্রম, কারণ ট্রাম্পের কর্মপদ্ধতিতে কোনো প্রথাগত ও সুনির্দিষ্ট ‘ডকট্রিন’ বা মতবাদ কখনো ছিলই না এবং এর কোনো অস্তিত্বও নেই।
বর্তমান প্রশাসনের খণ্ডিত ও বৈচিত্র্যময় পদক্ষেপগুলোকে কোনো একক তাত্ত্বিক কাঠামোর আওতায় আনা অসম্ভব। লাতিন আমেরিকার একটি দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে সামরিক আঘাত হানা, রেকর্ড পরিমাণ উচ্চ শুল্ক প্রাচীর নির্মাণ কিংবা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তীব্র ভূরাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ; এসব ঘটনাকে প্রথাগত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বে ফেলা যায় না।
প্রথাগত উদারনৈতিক বা বাস্তববাদী নীতিমালার সমর্থকেরা এসব পদক্ষেপকে কখনো সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন প্রকাশ, আবার কখনো দৃঢ় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বলে আখ্যায়িত করছেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের এই কর্মযজ্ঞ কোনো সুসংহত কৌশলের ফল নয়, বরং এটি একটি মুহূর্তের মেজাজ বা পরিস্থিতিভিত্তিক সিদ্ধান্তের প্রতিফলন। ঐতিহ্যবাহী পররাষ্ট্রনীতির কারবারিরা যে অর্থে কোনো মতবাদের কথা বলেন, ট্রাম্প সেভাবে দেশ পরিচালনা করেন না।
মার্কিন এই প্রেসিডেন্টের কার্যপ্রণালী কোনো তাত্ত্বিক সিলেবাস বা মতবাদের ছকে বাঁধা নয়; বরং তিনি একজন দক্ষ ব্যবসায়ীর মতো প্রতিটি পরিস্থিতিকে আলাদাভাবে, দরকষাকষির ক্ষমতা এবং ব্যক্তিত্বের নিরিখে মূল্যায়ন করেন। ফলে তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত তার নিজের কাছে অত্যন্ত ধারাবাহিক মনে হলেও প্রথাগত বিশ্লেষকদের কাছে তা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর ঠেকে। ট্রাম্পের প্রাথমিক বাস্তববাদী উপলব্ধিগুলো; যেমন ন্যাটোর ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর অতিরিক্ত নিরাপত্তা নির্ভরতা কমানো এবং অন্তহীন বিদেশি যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে গুটিয়ে আনা; তাত্ত্বিকভাবে সঠিক হলেও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত অপরিকল্পিত ও বিশৃঙ্খল রূপ নিয়েছে। শৃঙ্খলাহীন ও অতিদ্রুত সিদ্ধান্তের কারণে এটি সুসংহত কৌশলের পরিবর্তে অনেক সময় বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত হয়।
ওয়াশিংটনের নীতি-নির্ধারণী মহল ও থিংকট্যাংকগুলো যতই ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের সুনির্দিষ্ট কোনো ডকট্রিন আবিষ্কারের চেষ্টা করুক না কেন, এর বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। হয়তো বহু বছর পর ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদরা নিজেদের সুবিধার্থে এই নীতিমালার ওপর কোনো তকমা বা নাম এঁকে দেবেন, যা বর্তমান সময়ের প্রকৃত পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাবে না। তবে এই অস্তিত্বহীন ডকট্রিন খুঁজে বেড়ানোর প্রবণতাটি প্রমাণ করে যে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতি সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবী সমাজ প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে অভ্যস্ত নয়।







