অপারেশন সিঁদুরের পর পাকিস্তানি রুপির বিপরীতে ভারতীয় রুপির ঐতিহাসিক দরপতন ঘটেছে। বিগত এক বছরে পাকিস্তানের মুদ্রার বিপরীতে ভারতের মুদ্রা দর হারিয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। শুধু পাকিস্তানি রুপিই নয়, এই একই সময়ে বাংলাদেশি টাকার বিপরীতেও ভারতীয় রুপি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। ঢাকার বাজারে রুপির মান কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যারের এক প্রতিবেদনে ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের এই নজিরবিহীন চিত্র সামনে এসেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ মে প্রতি ভারতীয় রুপির বিপরীতে পাকিস্তানি রুপির দর যেখানে ছিল ৩.২৯১৩, চলতি বছরের ১৮ মে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ২.৯০১০ পাকিস্তানি রুপিতে। অর্থাৎ এই সময়ে ভারতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ১১.৮৬ শতাংশ, যার মধ্যে কেবল চলতি বছরেই দর কমেছে ৬.৮ শতাংশ। পাশাপাশি বাংলাদেশি টাকার বিপরীতে প্রতি রুপির দর ১.৪২ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১.২৮ টাকায়। টানা দুই বছর ধরে এশিয়ার সবচেয়ে খারাপ পারফর্ম করা মুদ্রা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে ভারতীয় রুপি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, এই তীব্র দরপতন প্রমাণ করে যে ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট কেবল বিশ্ববাজারে ডলারের শক্তিবৃদ্ধি বা পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে নয়। বরং এই তথ্য নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের অভ্যন্তরীণ নীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মৌলিক দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করছে। উদীয়মান অর্থনীতির অন্যান্য দেশগুলো একই ধরনের আন্তর্জাতিক ধাক্কার মুখে পড়লেও পাকিস্তানি রুপির বিপরীতে তাদের মুদ্রার এমন পতন ঘটেনি। অথচ পাকিস্তান নিজেই গত বছর আইএমএফের সাহায্য নিয়ে কঠোর আর্থিক নীতিমালার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান এই পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অতীত রাজনৈতিক অবস্থানকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ২০১২ ও ২০১৩ সালে তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের আমলে রুপির সামান্য অবমূল্যায়ন নিয়ে লাগাতার সরব হয়েছিলেন মোদি। তখন তিনি দাবি করেছিলেন, রুপির দরপতন আসলে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যর্থতা ও দুর্বল শাসনেরই প্রত্যক্ষ প্রতিফলন। একই সাথে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণাত্মক জাতীয়তাবাদী ভাষা ব্যবহার করে নিজেকে একজন দৃঢ়চেতা নেতা হিসেবে দাবি করতেন তিনি। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থাকার এক দশক পর আজ তার নিজের আমলেই পাকিস্তানি রুপি ও বাংলাদেশি টাকার বিপরীতে ধারাবাহিকভাবে দর হারাচ্ছে ভারতের মুদ্রা।
মোদি সরকার ও তার নীতিমালার ওপর আন্তর্জাতিক মহলের ক্রমবর্ধমান অনাস্থা নিয়ে সম্প্রতি এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস। সেখানে বলা হয়েছে, রুপির এই পতনের ফলে ভারতীয়দের বিদেশে পড়াশোনা, ব্যবসা বা ভ্রমণের খরচ আকাশচুম্বী হচ্ছে। এমনকি জাপানি ব্যাংক এমইউএফজি এক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ যাই হোক না কেন, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে চলতি বছরের শেষপর্যন্ত ভারতীয় রুপির এই পতনধারা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই প্রবল।







