ভাইয়ের জন্য মিড-ডে মিলের ডিম পকেটে লুকিয়ে ভাইরাল খুশি

‘আমি তো প্রতিদিনই খাই! একদিন ভাইয়ের জন্য নিয়ে যাচ্ছি, তাতে কী হয়েছে?’ ফোকলা দাঁতের এক চিলতে হাসির সঙ্গে বলা এই কথাটিই হাজারো মানুষের চোখে জল এনে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাটের জয়েন খাঁ অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী, ছয় বছরের খুশি কর এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আবেগঘন এক নাম।

প্রতিদিনের মতো বুধবার স্কুলে মিড-ডে মিল খেতে বসেছিল খুশি। কিন্তু সেদিনও অন্য দিনের মতো নিজের ভাগে পাওয়া সেদ্ধ ডিমটি না খেয়ে চুপিচুপি স্কুল ড্রেসের পকেটে লুকিয়ে রাখে সে।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাদ্দাম হোসেন বিষয়টি দেখে মজা করে জানতে চান, ‘ডিমটা পকেটে রেখেছিস কেন?’ তখন খুশি জানায়, ডিমটি সে বাড়িতে থাকা ছোট ভাই রুদ্রনীলের জন্য নিয়ে যাবে।

শিক্ষক প্রথমে কিছুটা অবাক হলেও পরে নিজের মোবাইল ফোনে খুশির সঙ্গে কথোপকথনের ভিডিও ধারণ করেন। পরে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করলে তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।

খুশির এক সহপাঠী জানায়, সে কোনো দিনই স্কুলের ডিম খায় না। সপ্তাহে একদিন পাওয়া সেই ডিমটি সব সময় ছোট ভাইয়ের জন্য বাড়িতে নিয়ে যায়।

খুশির বাবা শম্ভু কর একজন ইজিবাইকচালক। অভাবের সংসারে বড় হওয়া ছোট্ট মেয়েটি হয়তো খুব অল্প বয়সেই দায়িত্ববোধ শিখে গেছে। স্কুলে সবজি-ভাত বা খিচুড়ি খেয়ে সন্তুষ্ট থাকে সে, আর ডিমটি তুলে রাখে ভাইয়ের মুখে তুলে দেওয়ার জন্য। ভাইকে ডিম খাওয়াতে পারলেই যেন তার আনন্দের সীমা থাকে না।

ভাইয়ের প্রতি খুশির এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই হাজারো মানুষ আবেগাপ্লুত হন। অনেকেই ভিডিওটি শেয়ার করে ছোট্ট মেয়েটির প্রশংসা করেন এবং তার পরিবারের খোঁজখবর নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে সহকারী শিক্ষক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আমি দেখি খুশির পাতে ডিম নেই। জিজ্ঞাসা করতেই সে বলল, ডিমটি পকেটে রেখেছে। পরে জানাল, ছোট ভাইয়ের জন্য নিয়ে যাবে। কথাটা শুনে আমি সত্যিই থমকে গিয়েছিলাম। এত ছোট একটি শিশুর ভাইয়ের প্রতি এমন ভালোবাসা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। আমরা বড়রা অনেক সময় নিজের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত থাকি, অথচ এই শিশুটি নিজের প্রিয় খাবারটুকুও ভাইয়ের জন্য ত্যাগ করতে পেরেছে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার জয়েন খাঁ অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে খুশিকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তার হাতে উপহার সামগ্রী ও শুভেচ্ছা স্মারক তুলে দেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং অন্যান্য কর্মীরা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন খুশির বাবা শম্ভু করও।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা বলেন, আত্মকেন্দ্রিকতার এই সময়ে এত অল্প বয়সে খুশির দায়িত্ববোধ ও ভাইয়ের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা সত্যিই অনুকরণীয়। তাদের প্রত্যাশা, বড় হয়ে খুশি একজন সৎ, সংবেদনশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে সমাজের মুখ উজ্জ্বল করবে।

Scroll to Top