যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নতুন মোড় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগামী ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে এখন থেকেই নিজের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত দলের জাতীয় কনভেনশনের পর ভ্যান্সের দেওয়া বেশ কিছু ভাষণের পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রেকর্ডকে এড়িয়ে গিয়ে নিজের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নীতি ও চিন্তাভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
পরাজয়ের ধাক্কা সামলাতে নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স ট্রাম্পের চেয়ে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, বৈদেশিক নীতিতে সংযম এবং জননিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে বেশি মনোযোগ দেন। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলেই এই নীতিগুলো পপুলিস্ট আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল, তবে ভ্যান্স বর্তমানে এগুলোর প্রধান পতাকাবাহী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করছেন। বেশ কিছু মতামত জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের কমতে থাকা জনপ্রিয়তা রিপাবলিকান প্রার্থীরা হেরে যাওয়ার অন্যতম একটি বড় কারণ ছিল। আর তাই ভ্যান্স কৌশলগতভাবেই ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ কিংবা ঢালাও অভিবাসী বিতাড়নের মতো ট্রাম্পের বিতর্কিত পদক্ষেপগুলো থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে রাখেন।
বুধবার এক ব্যতিক্রমী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স দলের নির্বাচনী বিপর্যয়ের জন্য সরাসরি ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেন এবং দল পুনর্গঠনের একটি রূপরেখা তৈরি করেন। তিনি এই সংঘাত দ্রুত অবসানের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ কমানো, বৈদেশক সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন এবং ইসরায়েলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের একটি আধুনিক কাঠামো গড়ার ওপর জোর দেন। যদিও ভ্যান্স প্রকাশ্যে এখনো প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার কথা ঘোষণা করেননি এবং ট্রাম্পও কাউকে উত্তরসূরি ঘোষণা করেননি, তবুও রিপাবলিকানদের জন্য ২০২৮ সালের রাজনীতিতে ভ্যান্স নিজেকে ট্রাম্পের বিকল্প আবার একই সাথে তার সমর্থক গোষ্ঠীকে ধরে রাখার মতো এক সুবিধাজনক অবস্থায় নিয়ে যেতে চাইছেন।
ভ্যান্সের এই বক্তব্যে ট্রাম্পের সাথে প্রকাশ্য কোনো বিরোধ তৈরি না হলেও দুই নেতার অবস্থানের মধ্যকার ফারাক পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। ট্রাম্প সম্প্রতি সাধারণ মানুষের নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে উদ্বেগকে ডেমোক্র্যাটদের একটি চক্রান্ত বলে আখ্যা দিয়েছিলেন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অনুরোধে ইরান যুদ্ধের সূচনা করে তার সিদ্ধান্ত সমর্থন করে যাচ্ছেন।
তবে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়ািলসকে বুধবার সরিয়ে দিয়ে তার স্থানে ট্রাম্প হার্ডলাইনার স্টিফেন মিলারকে বসিয়েছেন, যা ট্রাম্পের কঠোর নীতি ধরে রাখার মানসিকতার পরিচয় দেয়। অন্যদিকে, ভ্যান্সের এহেন পদক্ষেপকে রক্ষণশীলদের মধ্যে নতুন করে বিতর্ক শুরু করার এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের পদকে নিজের এজেন্ডা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ভ্যান্সের এই নতুন কৌশল সত্ত্বেও নির্বাচনের এই খারাপ ফলাফলের দায় পুরোপুরি এড়াতে পারছেন না তিনি নিজেই। ওহাইও এবং অন্যান্য অঙ্গরাজ্যে ভ্যান্স যেসব প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন, তারাও পরাজিত হয়েছেন। পাশাপাশি অন্যান্য সম্ভাব্য রিপাবলিকান প্রার্থীরা, যেমন টেক্সাসের সেনেটর টেড ক্রুজ কিংবা ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসও নির্বাচনে দলের পরাজয় নিয়ে নিজস্ব ব্যাখ্যা তুলে ধরে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। আবার ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদদের মতে, ভবিষ্যতে যে প্রার্থীই আসুক না কেন, তাকে ট্রাম্পের অনুসৃত নীতির ছাপ বয়ে বেড়াতে হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজের চারপাশের সন্তানদের জন্য সমৃদ্ধ ও নিরাপদ দেশের স্বপ্নের কথা বলে ভ্যান্স যেভাবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে চাচ্ছেন, তা তার আগামী দিনের বড় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিরই একটি অংশ।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ






