করোনায় বাতিল হয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি আদেশ

ফাইল ছবি

বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসে মৃত্যু ছাড়িয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার। একইসঙ্গে প্রতিদিনই নতুন করে যোগ হচ্ছে মৃত্যু। বাংলাদেশেও আক্রান্ত বাড়ছে দিনদিন। এ পর্যন্ত মৃত্যুও হয়েছে পাঁচজনের। এর প্রভাব পড়ছে সর্বত্র। দেশের তৈরি পোশাকখাতেও। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির মধ্যে একের পর এক রপ্তানি আদেশ বাতিল হচ্ছে বাংলাদেশের। অনেক বিদেশি ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে ক্রয়াদেশ বাতিল করেছে। বিশেষত যেসব পণ্য উত্পাদনের পর্যায়ে রয়েছে, তা বাতিল করছে। এমনকি উত্পাদন হওয়া পণ্যের জাহাজিকরণও বাতিল করছে।

ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, চীন থেকে শুরু করে বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার পাশাপাশি সংক্রমণ ঠেকাতে জনজীবন অনেকটাই অচল। এর নেতিবাচক প্রভাব বিশ্ব বাণিজ্যের পাশাপাশি দেশের বাণিজ্যেও পড়েছে।

ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির ফলে চলতি অর্থবছরের শেষে দেশের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, এরই মধ্যে সরকার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশ করেছে। এর পরও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে। কেননা রপ্তানি আয় ইতিবাচক ধারায় নিয়ে যেতে হলে আগামী ছয় মাস, ১২ থেকে ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করতে হবে।

তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সোমবার (৩০মার্চ) পর্যন্ত সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এরই মধ্যে বিদেশি ক্রেতারা ২৮৭ কোটি ডলারের রপ্তানি আদেশ বাতিল করেছে। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে ১ হাজার ৪১টি কারখানার।

রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ক্রয়াদেশ বাতিলের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নিয়মনীতি মানছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জন রপ্তানিকারক গণমাধ্যমকে বলেন, পাশ্চাত্যের ক্রেতারা সব সময় টেকসই সরবরাহ চেইনের কথা বলেন। কিন্তু তাদের ক্রয়াদেশ বাতিলে কারখানার উদ্যোক্তারা যে পরিমাণ ক্ষতির শিকার হচ্ছেন, তার দায় কে নেবে? এই দ্বৈত রূপ রেখে টেকসই করার কথা কি তাদের মুখে শোভা পাবে?

তবে এ পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তির খবর দিয়েছে ইউরোপভিত্তিক দেশের সবচেয়ে বড়ো ক্রেতা ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএম। সুইডেনভিত্তিক এ ব্র্যান্ড জানিয়েছে, তাদের ক্রয়াদেশ দেওয়া যেসব পণ্য এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে কিংবা উত্পাদন পর্যায়ে চলে গেছে—ঐসব ক্রয়াদেশ বাতিল করা হবে না।

শুধু তা-ই নয়, এসব পণ্যের বিষয়ে নতুন করে কোনো দরাদরিও (দর কমানোর অনুরোধ) করবে না। একই সঙ্গে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় সহযোগিতার আশ্বাসসহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও জোর দিয়েছে তারা। সম্প্রতি এইচঅ্যান্ডএম বাংলাদেশে তাদের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ সংক্রান্ত একটি বার্তা পাঠিয়েছে।

অবশ্য করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী ভোক্তার চাহিদা কমে যাওয়ায় আপাতত বর্তমান পরিস্থিতিতে আর রপ্তানি আদেশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, যেসব ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছে, সেখানেও (যা উত্পাদন পর্যায়ে যায়নি) পরিবর্তন আসবে।

এইচঅ্যান্ডএম বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ২৫০ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ পণ্য ক্রয় করে। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কোনো নিয়মনীতি না মেনেই ঢালাওভাবে ক্রয়াদেশ বাতিল করায় বড়ো ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন গার্মেন্টস খাতের উদ্যোক্তারা। এমন পরিস্থিতিতে উত্পাদনে থাকা কিংবা তৈরি হওয়া পণ্যের রপ্তানি আদেশ বাতিল না করার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রপ্তানিকারকরা।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ইপিজেডে অবস্থিত ডেনিম এক্সপার্টের মালিক ও ইউরোপে অন্যতম রপ্তানিকারক মোস্তাফিজ উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, এইচঅ্যান্ডএমের এ বার্তা আমাদের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তির। অন্যরা ঢালাওভাবে ক্রয়াদেশ বাতিল না করে এইচঅ্যান্ডএমের এ উদ্যোগ অনুসরণ করা উচিত।