সংক্রমণ আটকে রাখতে মাস্ক কি সহায়তা করেছে? এশিয়ায় শুধু মাস্ক আর মাস্ক

ছবিঃ সংগৃহীত

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় এশিয়া অঞ্চলে মাস্কের ব্যবহার বেশি দেখা যাচ্ছে। এমনকি সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের কাছে অনুরোধ করা হচ্ছে, যথেষ্ট পরিমাণ মাস্ক চিকিৎসাকর্মীদের জন্য সংরক্ষণ করতে। প্রশ্ন উঠছে, সংক্রমণ আটকে রাখতে মাস্ক কি সহায়তা করেছে?

গবেষকেরা একমত, যে সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ঠান্ডা ও হে ফিভারের সময় ব্যবহার করা হয়, তা করোনাভাইরাস সংক্রমণ পুরোপুরি রোধ করার সঠিক উপায় নয়।

তকরোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এ ভাইরাস যেন না ছড়ায়, এ জন্য মাস্ক পরার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে বোঝার আগেই করোনা সংক্রমিত হওয়ার প্রমাণ রয়েছে। এ জন্য মাস্ক ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে এই অঞ্চলে। মানুষের বিশ্বাস এটি করোনা সংক্রমণ সীমিত করে দিতে পারবে।

এশিয়ার কিছু অঞ্চলে করোনা মহামারি ঠেকানোর প্রতিক্রিয়া হিসেবে মাস্ক পরাটাকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গতকাল বুধবার জাপান সরকার ঘোষণা দিয়েছে, প্রতিটি বাড়িতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাপড়ের দুটি মাস্ক থাকতে হবে। হংকংয়ের নাগরিকেরা নিজে মাস্ক করছেন এবং বিদেশে আত্মীয়দের কাছে মাস্ক পাঠাচ্ছেন।

হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব পাবলিক হেলথের পরিচালক কেইজি ফুকুদা বলেন, ‘এ শহরের মানুষ মাস্ক পরাকে নিজেকে রক্ষার পাশাপাশি বৃহৎ সমাজকে সুরক্ষা চেষ্টার অংশ হিসেবে দেখে। কিন্তু আমি যখন যুক্তরাষ্ট্রে বড় হয়েছিলাম, তখন একে ব্যক্তিগত লঙ্ঘন বা একটি অযাচিত চাপানো বাধ্যবাধকতা হিসেবে কেউ কেউ দেখতেন। এশিয়ার কিছু অঞ্চলে মাস্ক পরার কারণে সংক্রমণের হার ও মৃত্যুর ঘটনা কম। এর মধ্যে জাপান ও হংকং রয়েছে। পরা না পরা নিয়ে তত্ত্বের কিছু পার্থক্য সৃষ্টি করে।’

তবে বিশেষজ্ঞরা মাস্ক পরা নিয়ে সন্দেহের মধ্যে রয়েছেন। হংকংয়ের একই প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক বেন কাউলিং শুধু মাস্ক পরাকে কৃতিত্ব দেওয়ার চেয়ে এ অঞ্চলের সরকারগুলোর গৃহীত অন্যান্য ব্যবস্থার কথা বলেন। তিনি বলেন করোনাভাইরাসে সংক্রমিত ব্যক্তিকে শনাক্ত করে আইসোলেশনে রাখা, তাদের সংস্পর্শে আসা লোকজনকে খুঁজে বের করে কোয়ারেন্টাইনে রাখা ও সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি করা এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।’

বিশেষজ্ঞ ফুকুডা সতর্ক করে বলেন, মাস্ক পরে একে জাদু ভাবা ঠিক হবে না। এটা মিথ্যা নিরাপত্তার ভাবনা তৈরি করতে পারে। সিঙ্গাপুরের মতো অনেক জায়গা আছে, যেখানে মাস্ককে ততটা গুরুত্ব না দিয়েও করোনা সংক্রম বিস্তার রোধে ভালো করেছে। সংক্রমিত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা, ঠিকমতো সমন্বয় ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মতো পুরো প্যাকেজ গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মাস্ক ব্যবহারের বিষয়ে এখনো আগের অবস্থানেই রয়েছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে মাস্ক পরতে পরামর্শ দেওয়া হয়নি। মাস্কের ঘাটতি ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য তা বিশেষ প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে।

অনেক বিশেষজ্ঞ অবশ্য মাস্ক পরতে গিয়ে হিতে বিপরীত হওয়ার কথা বলছেন। যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সেলুলার মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সিমন ক্লার্ক বলেন, ‘মাস্ক মানুষকে সুরক্ষার একটি ভুল ধারণা দিতে পারে।’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, মাস্ক ব্যবহারের পক্ষে পরামর্শ দেওয়া ব্যক্তিরা সামাজিক দূরত্বের ব্যবস্থাগুলো মেনে চলা অনিচ্ছুক ব্যক্তিকে উৎসাহিত করতে পারে।

সিমন আরও বলেন, ‘এমনও পরিস্থিতি অনুমান করা যায়, যেখানে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকিতে থাকা সংক্রমিত ব্যক্তিরা মাস্ক পরে মনে করতে পারে, তাদের বাইরে যেতে কোনো বাধা নেই।’

অবশ্য মাস্ক ব্যবহারের পক্ষে শক্ত কোনো প্রমাণ না থাকলেও পশ্চিমা অনেক দেশের কর্মকর্তারা এখন মাস্ক ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার পথেই হাঁটছেন। ইতিমধ্যে অস্ট্রিয়া ও স্লোভেনিয়া মাস্ক ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ও আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশন ডিজিজেসের পরিচালক অ্যান্থনি এস ফাউসি বলেছেন, এ সপ্তাহে সরবরাহ স্থিতিশীল হলে মাস্ক পরার পরামর্শ বাড়ানো হবে, যাতে করোনাভাইরাস ছড়াতে না পারে।

বিশেষজ্ঞ কাউলিং বলেন, মাস্ক ব্যবহারের নীতিমালার জন্য আরও গবেষণা দরকার, যাতে কোনো ধরনের কাজে লাগবে এবং কীভাবে তা পরতে হবে, এ নির্দেশনা থাকবে। আমি মনে করি, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে দেশগুলো। যদি পরে সামান্য পরিমাণে হলেও করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকানো যায়, তবে তা করাই যুক্তিযুক্ত হবে।