১৬২টি আসন-বিপুল অর্থশক্তি: বাংলাদেশে জামায়াতের নির্বাচনী উত্থান কেন ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ

বাংলাদেশের ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, জামায়াতে ইসলামির রাজনৈতিক তৎপরতাও তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দলটি আর প্রান্তিক কোনো ইসলামপন্থী শক্তি হিসেবে সীমিত বা দুর্বল প্রভাব বিস্তারের পথে নেই। বরং সূত্রের দাবি, জামায়াত এখন একটি ঠান্ডা মাথার, তথ্যনির্ভর ও লক্ষ্যভিত্তিক কৌশল বাস্তবায়ন করছে—যার মূল লক্ষ্য সারা দেশে উপস্থিতি দেখানো নয়, বরং নির্দিষ্ট আসনে নিশ্চিত জয়।
\বাংলাদেশের ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, জামায়াতে ইসলামির রাজনৈতিক তৎপরতাও তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দলটি আর প্রান্তিক কোনো ইসলামপন্থী শক্তি হিসেবে সীমিত বা দুর্বল প্রভাব বিস্তারের পথে নেই। বরং সূত্রের দাবি, জামায়াত এখন একটি ঠান্ডা মাথার, তথ্যনির্ভর ও লক্ষ্যভিত্তিক কৌশল বাস্তবায়ন করছে—যার মূল লক্ষ্য সারা দেশে উপস্থিতি দেখানো নয়, বরং নির্দিষ্ট আসনে নিশ্চিত জয়।
সিএনএন–নিউজ১৮–এর হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, জামায়াতের নীতিনির্ধারকরা আসনভিত্তিক বিস্তৃত বিশ্লেষণ চালিয়েছেন। এতে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনের ভোটের তথ্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ জরিপের ফলাফল যুক্ত করা হয়েছে। ৩০০টি সংসদীয় আসন জুড়ে পরিচালিত এই বিশ্লেষণের ফলেই দলের লক্ষ্য ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় বড় ধরনের পুনর্মূল্যায়ন ঘটে।২০২৪ সালের অক্টোবরের মধ্যে জামায়াত তাদের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য সংকুচিত করে ১৬২টি আসনে নিয়ে আসে—যেসব আসনে সমন্বিত প্রচেষ্টায় জয় সম্ভব বলে তারা মনে করছে। অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো একে ‘বুদ্ধিদীপ্ত সংহতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। শক্তি ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে বাকি ১৩৮টি আসন থেকে জনবল, অর্থ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম ইচ্ছাকৃতভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উঠে এসেছে রাজধানী ঢাকা। প্রতীকী গুরুত্ব, গণমাধ্যমে উচ্চ দৃশ্যমানতা এবং জাতীয় রাজনৈতিক বয়ান গঠনের ক্ষমতার কারণে রাজধানীর প্রায় ২০টি আসনে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি।জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণায় বক্তৃতা বা স্লোগানের চেয়ে কৌশলগত ব্যবস্থাপনাই প্রাধান্য পাচ্ছে। মাঠপর্যায়ের সংগঠিত কার্যক্রমকে তারা কার্যত একটি ‘বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া’ হিসেবে পরিচালনা করছে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, ডাকযোগে ভোট (পোস্টাল ভোটিং) জামায়াতের কৌশলের একটি প্রধান স্তম্ভ। দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫ লাখ প্রবাসী ভোটারকে ডাকযোগে ভোট দিতে সংগঠিত করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশে থাকা ভোটারদের একটি বড় অংশকে আগেভাগেই সুপরিকল্পিতভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

শহরাঞ্চলে, বিশেষ করে ঢাকায়, জামায়াতের নারী শাখা ও ইসলামী ছাত্রী সংস্থা ঘরে ঘরে গিয়ে জরিপ চালাচ্ছে ভোটারদের আচরণ বিশ্লেষণের জন্য। ভোটের দিন ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করাও এসব টিমের অন্যতম দায়িত্ব।

জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা ফজরের নামাজের পরপরই ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে লাইনে সংখ্যাগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো এটিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে পরীক্ষিত কৌশলের জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োগ হিসেবে দেখছে।

অর্থশক্তি ও লক্ষ্যভিত্তিক প্রভাব

আর্থিক সক্ষমতাই জামায়াতের আত্মবিশ্বাসের প্রধান ভিত্তি বলে মনে করা হচ্ছে। সূত্রের দাবি, দলটি ১৬২ থেকে ১৮৮টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত আসনের প্রতিটিতে ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় করার পরিকল্পনা করেছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)–সহ মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণা ব্যয়ও জামায়াত বহন করছে বলে জানা গেছে।

তৃণমূল পর্যায়ে জামায়াতকর্মীরা দরিদ্র ভোটারদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, মোবাইল নম্বর এবং বিকাশ, নগদ ও রকেট অ্যাকাউন্ট–সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রের মতে, ভোটের আগে লক্ষ্যভিত্তিক নগদ অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে ভোটার আচরণ প্রভাবিত করতে এই তথ্য ব্যবহার করা হতে পারে।

বিভক্ত বিরোধী রাজনৈতিক ময়দান

জামায়াত যখন নিজেদের অবস্থান সংহত করছে, তখন বিএনপি-নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ক্রমেই বিভক্ত হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র অনুযায়ী, ৭০ থেকে ৮০টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী উঠে আসতে পারে, যা প্রচারণার শৃঙ্খলা দুর্বল করবে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে চাঁদাবাজি, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার অভিযোগ বিএনপির সহযোগী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবিরের তুলনায় বেশি উঠেছে বলে জানা গেছে। এতে বিরোধী শক্তি হিসেবে বিএনপির নৈতিক অবস্থানও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

জামায়াতের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো ব্যক্তিগতভাবে দাবি করছে, দলটি ২০৫ থেকে ২১০টি আসন পেতে পারে, যেখানে বিএনপি জোটের আসনসংখ্যা নেমে আসতে পারে ৯০ থেকে ৯৫–এ। একই দিনে গণভোট অনুষ্ঠিত হলে এই অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।

সূত্রের মতে, সম্ভাব্য গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মুহাম্মদ ইউনূসের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথ তৈরি হতে পারে—যার পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।

ভারত কেন সতর্ক নজরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে

জামায়াতের এই উত্থান ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ঢাকায় জামায়াত-নেতৃত্বাধীন বা জামায়াত-প্রভাবিত সরকার গঠিত হলে তা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে—বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু অঞ্চলে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, জামায়াতের আদর্শিক ভিত্তি ও ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোর সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক সংযোগ দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের অরক্ষিত ও ঢিলেঢালা সীমান্ত অঞ্চলটিকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। সীমান্তবর্তী অবস্থান ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ইতিহাসের কারণে উত্তর ২৪ পরগনার মতো জেলাগুলো বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে। ঢাকার দিক থেকে আইনপ্রয়োগ বা রাজনৈতিক বার্তায় সামান্য পরিবর্তনও তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দক্ষিণ ২৪ পরগনাকে সীমান্তপারের সহায়তাকারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে মৎস্য ও গবাদিপশু পরিবহন রুট ব্যবহার করে। মুর্শিদাবাদের জনসংখ্যাগত সংবেদনশীলতা আদর্শিক প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। মালদা ও নদিয়া জেলায় নিয়োগ ও লজিস্টিক সহায়তা কার্যক্রমের ওপর নজরদারি চলছে, আর কোচবিহার ও উত্তরবঙ্গের পরিস্থিতি আসাম ও ত্রিপুরা পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আশঙ্কা।

Scroll to Top