সরকারের ঘোষণা মতো ঐতিহাসিক না হোক, সেরার সেরা না হোক; ১৪, ১৮, ২৪ স্টাইলে না হয়ে অন্তত মধ্যমানের একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও সন্তুষ্টির অপেক্ষায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাদের চোখে-মুখে আকাঙ্ক্ষার পারদে ঘুরছে একটি নির্বাচন ও নির্বাচিত সরকার। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা সীমিত। স্বাভাবিক চলাফেরা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি, নিত্যপণ্যের দাম যথাসাধ্য আয়ত্তে থাকলেই তারা সন্তুষ্ট।
আর ব্যবসায়ী মহলের অপেক্ষা ব্যবসা-বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটার। উপরোক্ত সব মহলেরই বিশ্বাস, নির্বাচিত সরকার এলে তাদের এ প্রত্যাশা রাতারাতি পূরণ না হোক, অন্তত একটা বাতাবরণ তৈরি হবে। জনসাধারণ ভোগান্তি টের পায়, তবে আংকিক বা সংখ্যাগত তথ্য রাখে না। সরকারের কাছে যথা নিয়মে জনভোগান্তির তথ্যও থাকে।
সরকারি তথ্য-উপাত্ত বলছে, বিদায়ি বছরের ডিসেম্বর মাসেও মূল্যস্ফীতি আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে। নভেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশ ছিল, ডিসেম্বরে যা আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশে। অর্থাৎ মাসিক ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। বাসাভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয়ের এ চাপ একেকটি পরিবারকে কোন মাত্রায় ভোগাচ্ছে- এর গাণিতিক হিসাব তাদের অনেকের কাছেই নেই।
তবে তারা বোঝে নির্বাচিত-রাজনৈতিক-স্ট্যাবল সরকার এলে এ অবস্থা থাকবে না।
এমন একটা অপেক্ষার মাঝে, গজবের মতো নেমেছে চাঁদাবাজির নতুন খড়্গ। নির্বাচন সামনে রেখে চাঁদাবাজিতে এক নয়া ভেরিয়েন্ট। ঘটনা রীতিমতো ধারণার বাইরে। ছোট, বড়, মাঝারি বলে ভেদ নেই; ফুটপাতের হকার, টং দোকানদার, পাবলিক টয়লেট কোথায় নেই তারা? টং দোকানদার থেকে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, সামর্থ্যবান পরিবার কারোরই ছাড় নেই এ চাঁদার আওতা থেকে।
এমনিতেই ব্যবসায়ীদের সমানে খলনায়ক বানানোর হর্সরেস এখনো থামেনি। মববাজি, যাকে-তাকে অপরাধী সাজিয়ে মামলায় জড়ানো, কারাগারে আটকানো, দেশান্তরী করা, নইলে দেশে পলাতক থাকতে বাধ্য করা, মিল-কারখানার চাকা আটকে দেওয়া, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বিকৃত আনন্দমেলা উপভোগ এখনো চলমান। আশা করা হয়েছিল, নির্বাচনের গাড়ি চলতে শুরু করলে এ আজাব কাটতে শুরু করবে। তা বাস্তবে ফলেনি। নতুন উদ্যমে ভয়-অনিশ্চয়তা আরো পাখা মেলেছে। অর্থনীতির ধীরগতি, বিনিয়োগহীনতা, নিয়োগে বন্ধ্যত্ব, মূল্যস্ফীতির উচ্চচাপ, ব্যাংক খাতের অনিশ্চয়তা, ঋণের চড়া সুদ, বৈশ্বিক মন্দা পরিস্থিতি কেবল ব্যবসায়ীদের ভোগাচ্ছে না, কর্মজীবী, চাকরিজীবীসহ সাধারণ মানুষকে কাবু করে চলছে চরমভাবে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এককভাবে কাউকে ভোগায় না। মাত্রাগত ও দৃশ্যত ব্যবসায়ীদের বেশি আক্রান্ত করে। যে কারণে নির্বাচিত ও রাজনৈতিক সরকারের আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ তাঁদের মধ্যে একটু বেশি। সেই আলোকে অপেক্ষাটাও তীব্র পর্যায়ে। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির দুর্গতির তথ্য সরকারের কাছে আছে আরো বেশি। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ-জিইডির প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ স্টেট অব দি ইকোনমি ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধির বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প কার্যক্রমকে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরের কাছেও এসংক্রান্ত তথ্যের আপডেট রয়েছে। সরকারের উপরোক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে অনেকটা তথ্যদাতা। আর ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা। তার পরও তাঁদের বিশ্বাস, নির্বাচন হয়ে গেলে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে এ কুদশা কাটতে শুরু করবে। রাজনৈতিক দলগুলোও ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীদের দুর্গতি উপলব্ধির কথা জানিয়েছে। বলেছে, নির্বাচনের পর এ অবস্থা থাকবে না। বিজনেস কমিউনিটিরও বিশ্বাস জন্মেছে, রাতারাতি বা দ্রুত অবস্থা না বদলালেও প্রেক্ষাপট বদলাতে থাকবে। ধীরে ধীরে হলেও ব্যবসা গতি পাবে।
নতুন শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের পথরেখা দৃশ্যমান হবে। এমন বিশ্বাস ও অপেক্ষার মাঝে নির্বাচন সামনে রেখে চাঁদাবাজির বিষাক্ত ফণায় আক্রান্ত হবে, তা ছিল তাঁদের ধারণারও বাইরে। চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা পেতে কেউ কেউ অফিসে আসাও বন্ধ করে দিয়েছেন গত কিছুদিন ধরে। মুখ খুলে তা বলতে বা নালিশ করতেও পারছেন না। এই চাঁদাবাজদের স্টাইলে মারাত্মক ভেরিয়েন্ট। এরা একে চাঁদা, বখরা, বকশিশ বা সাহায্য-সহায়তা মনে করে না, নিজেদের পাওনা ভাবে। নির্বাচনের প্রার্থী হোক বা না হোক, সরাসরি বলে দিচ্ছে, ‘টাকা লাগবে’।
চব্বিশের ৫ আগস্টের পর নানা পরিচয়ে চাঁদার মাঠ দাবড়ানোর পর এরা এখন মহা পরাক্রমশালী। মাঠে নেমেছে দলেবলে সিনা টান করে। পরিবহন, ফুটপাত, বাজার, খেয়াঘাট, ঝুট ব্যবসা, ময়লার ভাগাড়, পাবলিক টয়লেট নিয়ন্ত্রণ- কিছুই বাদ দিচ্ছে না। তা-ও গোপনে বা আড়ালে-আবডালে নয়, বীরত্বের সঙ্গে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরিচয়ের এই তেলবাজরা দেশের ছোট-বড় ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারীদের ওপর আছর করার মতো অবস্থান নিয়েছে। এদের বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ভূমিকাও ইঙ্গিতবহ। এদের থাবা থেকে নিস্তার পেতে ব্যবসায়ীদের অনেকে ধরেছেন মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনের পথ। কিছুদিন ধরে স্বেচ্ছায় পলাতক বা গুম হওয়ার এ জীবনাতিপাত দেশের বেশ কিছু ব্যবসায়ী-শিল্পপতির। তৃণমূল পর্যায়ে মোটামুটি সামর্থ্যবান দোকানদার, মধ্যমমানের ব্যবসায়ীরাও উপায়ান্তর না পেয়ে এ পথ ধরেছেন। কোথাও অভিযোগ করে আরো বিপদ ডেকে আনার পথে যাচ্ছেন না তাঁরা।
এমনিতেই দেড় বছর ধরে মব সন্ত্রাস, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, মামলা-হামলার ভোগান্তিতে থাকা ব্যবসায়ীদের জন্য এটি বিপদের ওপর আপদ। কারো কারো প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখাই অসম্ভব পর্যায়ে। নির্বাচনের ডামাডোলে একটু আশাবাদী হয়ে অফিসমুখী হতে শুরু করেছিলেন তাঁরা। সামনে ভালো কিছুর আশাভরা অপেক্ষার মাঝে চাঁদাবাজির এ ধকল তাঁদের জন্য মরাকে আরো মারার অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে। আফসোস করে আক্রান্তদের অনেকে বলছেন, চাঁদা-বখরার শিকার হওয়া নিয়তির মতো হয়ে গেছে তাঁদের।
আক্ষেপের সঙ্গে মজা করে এক ব্যবসায়ী বলছিলেন, এ যন্ত্রণা থেকে কারাগারে বা বিদেশে পালিয়ে যাওয়া ব্যবসায়ীরা এ যাত্রায় নিরাপদেই আছেন। ঝামেলায় পড়ে গেছেন বনেদি-প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা, যাঁরা এমন অবস্থার মাঝেও সাহস করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সর্বসাধ্য চেষ্টা করছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও তাঁরা টানা ভুগেছেন ১৫-১৬ বছর। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের তোড়ে ওই সরকারটি বিতাড়নের পর এমন তাড়না থেকে বাঁচার আশাবাদ অরাজনৈতিক সরকার আমলে এবং একটি নির্বাচিত সরকারের আগমনের পূর্ববর্তী সময়ে এভাবে মার খাবে, তা তাঁদের কেবল ধারণাতীত নয়, সঙ্গে আরো অনেক কিছু ভাবনায় নিতেও বাধ্য করছে।







