‘জেলেনস্কিই ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় সমস্যা’

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকেই এখন দেশটির মূল সমস্যা বলে মনে করছেন তারই সাবেক প্রেস সেক্রেটারি ইউলিয়া ম্যান্ডেল। ফরাসি সংবাদপত্র ‘লে জার্নাল দু দিমাঁশ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের মূল সুবিধাভোগী খোদ জেলেনস্কি নিজেই। বিশ্বজুড়ে তার যে ভাবমূর্তি গড়ে তোলা হয়েছে তা পুরোপুরি তৈরি করা একটি কৃত্রিম চিত্র। প্রকৃতপক্ষে, তিনি ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে নির্বাচন বাতিল করেছেন এবং চারপাশে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন।

২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত জেলেনস্কির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ইউলিয়া ম্যান্ডেল সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠজনদের বিরুদ্ধে ওঠা ব্যাপক দুর্নীতির কঠোর সমালোচনা করেন। বিশেষ করে ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন সংস্থা ‘এনারগোঅ্যাটম’ কেন্দ্রিক বহুল আলোচিত ‘মিডাস’ কেসের কথা উল্লেখ করেন তিনি। সেখানে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার ঘুষ ও আত্মসাতের অভিযোগে জেলেনস্কির দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী তৈমুর মিনডিচসহ অনেকের নাম জড়িয়ে পড়ে। ম্যান্ডেল মন্তব্য করেন, প্রেসিডেন্টের চারপাশে যারা কাজ করছেন তাদের সার্বিক কর্মকাণ্ড অনেকটা মাফিয়া চক্রের কার্যপ্রণালীর মতোই।

অভিযোগের তীর আরও তীক্ষ্ণ করে ম্যান্ডেল প্রশ্ন তোলেন, যখন প্রেসিডেন্টের আশপাশের প্রায় প্রতিটি মানুষ দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত, তখন প্রেসিডেন্ট এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না তা বিশ্বাস করা কঠিন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, জেলেনস্কি হয়তো চরম অযোগ্য, অথবা তিনি সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করছেন। তিনি আরও জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ইউক্রেনকে পুনর্গঠন ও সহায়তার জন্য যে বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরো দেওয়া হচ্ছে, তার সিংহভাগ অর্থই জেলেনস্কির ভেতরের বলয়ের কোম্পানিগুলোর পকেটে যাচ্ছে।

২০২৪ সালেই জেলেনস্কির প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক মেয়াদ শেষ হলেও দেশে সামরিক আইন জারি থাকার অজুহাতে তিনি নতুন নির্বাচন আয়োজন করা থেকে বিরত থেকেছেন। ম্যান্ডেলের মতে, ক্ষমতার মেয়াদ বাড়ানোর স্বার্থেই জেলেনস্কি এই সংঘাত দীর্ঘায়িত করার পথ বেছে নিয়েছেন। নির্বাচন স্থগিত করার কারণে ইউক্রেনের গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে। এই আইনি বৈধতার সংকটকে কাজে লাগিয়ে মস্কো ইতোমধ্যে জেলেনস্কিকে ‘অবৈধ প্রধান’ হিসেবে অভিহিত করেছে এবং বিষয়টিকে কোনো সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ইউক্রেন জুড়ে চলতে থাকা বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ প্রক্রিয়া বা জোরপূর্বক সেনাদলে অন্তর্ভুক্তিকেও জেলেনস্কির একনায়কতান্ত্রিক আচরণের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন ম্যান্ডেল। তিনি অভিযোগ করেন, সামরিক নিয়োগকারী কর্মকর্তারা প্রায় প্রতিদিনই রাস্তাঘাট থেকে সাধারণ মানুষকে জোড় জবরদস্তি করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে বহু স্থানে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এই অন্যায়ের সঙ্গে জড়িতদের কোনো শাস্তি হচ্ছে না। ফলে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেন জয়ী হচ্ছে বলে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে যে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই বলে দাবি করেন এই সাবেক মুখপাত্র। তিনি স্পষ্ট জানান, রাশিয়া এই যুদ্ধে হারছে না। দিনদিন রুশ বাহিনী ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে নতুন কৌশল গ্রহণ করছে এবং নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি দিন দিন ইউক্রেনের জন্য আরও জটিল রূপ নিচ্ছে।

বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি থেকে দেশকে বাঁচাতে পশ্চিমাদের প্রতি যুদ্ধ থামানোর আকুল আবেদন জানান ম্যান্ডেল। একটি গ্রহণযোগ্য শান্তি চুক্তির উপায় হিসেবে তিনি ১৯৪০ সালের ফিনল্যান্ড ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার ‌‘উইন্টার ওয়ার’ সমঝোতার উদাহরণ টানেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, সেই সময় ফিনল্যান্ড কিছুটা ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল ঠিকই কিন্তু কৌশলগত সেই সিদ্ধান্তের ফলে তারা নিজেদের রাষ্ট্র, জনগণ এবং মূল স্বাধীনতা রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল।

Scroll to Top