সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে পাঁচ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়ার পর এশিয়ার একাধিক দেশ তাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কোভিড-১৯ মহামারির সময়কার মতো কড়া স্বাস্থ্যবিধি ও নজরদারি ব্যবস্থা পুনরায় চালু করেছে। কোনো কার্যকর প্রতিষেধক বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকায় নিপাহ ভাইরাসকে ঘিরে বৈশ্বিক উদ্বেগ দ্রুত গতিতে বাড়ছে। সীমান্তের এই পাশেও প্রশ্ন উঠছে—আমরা কি আদৌ প্রস্তুত? নাকি আগের মতোই ঝুঁকি জেনেও নিশ্চিন্তে থাকব, যতক্ষণ না প্রাণহানির খবর আমাদের ঘুম ভাঙায়?
শীত মৌসুম এলেই দেশে নিপাহ ভাইরাস নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়ায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এটি কোনো সাময়িক আতঙ্ক নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অসচেতনতার ফল। নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি যে কতটা ভয়াবহ, তা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (IEDCR) তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে শনাক্ত হওয়া ৩৪৭ জন নিপাহ রোগীর মধ্যে প্রায় ২৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা গড়ে প্রায় ৭১.৭ শতাংশ মৃত্যুহার নির্দেশ করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই হার আরো বেড়েছে, যা নিপাহকে দেশের অন্যতম প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগে পরিণত করেছে।
২০২৫ সালে পাবনা, ভোলা, চুয়াডাঙ্গা ও নওগাঁতে শনাক্ত হওয়া চারটি নিপাহ সংক্রমণের প্রতিটিতেই মৃত্যুহার ছিল শতভাগ। অর্থাৎ আক্রান্ত হওয়ার পর এক জন মানুষও বেঁচে ফেরেননি। এমন একটি বাস্তবতার পরও যদি আমরা নিপাহকে কেবল মৌসুমি আতঙ্ক হিসেবে দেখি, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে আত্মঘাতী দৃষ্টিভঙ্গি। আরো উদ্বেগজনক হলো-দেশের অন্তত ৩৫টি জেলা ইতিমধ্যে নিপাহ ভাইরাসের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।
২০০১ সালে মেহেরপুর জেলায় প্রথম নিপাহ সংক্রমণ শনাক্তের পর থেকে দেশে নিয়মিতভাবেই এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটছে, যার প্রধান বাহক ফলখেকো বাদুড় (Pteropus species)। সংক্রমণের পথও অজানা নয়-কাঁচা খেজুরের রস, বাদুড়ের আধা-খাওয়া ফল এবং সংক্রমিত ব্যক্তি বা পশুর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ। অথচ বছরের পর বছর এসব ঝুঁকি জেনেও আমাদের আচরণে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না।
শীত এলেই কাঁচা খেজুরের রস পান যেন একধরনের সামাজিক অনুশীলনে পরিণত হয়, যেখানে স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা উঠলেই সেটিকে ‘অতিরিক্ত ভয়’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে এখন আর নিপাহকে শুধু শীতকালীন বা খেজুরের রসনির্ভর রোগ বলে ভাবার সুযোগ নেই। বরং ভাইরাসটি আমাদের পরিবেশ ও খাদ্যাভ্যাসের গভীরে ঢুকে পড়েছে। ফলে ঝুঁকি এখন আরো বিস্তৃত ও জটিল।
যুক্তরাষ্ট্রের Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS)-এ ২০২০ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন, নিপাহ ভাইরাস আগের ধারণার চেয়েও বেশি সংক্রামক হতে পারে এবং যে কোনো সময় যে কোনো জনবসতিতে ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা রাখে। গবেষকদের আশঙ্কা, নিপাহ ভাইরাস বাংলাদেশ ও ভারতসহ এশিয়া অঞ্চলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের মহামারির কারণ হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এরই মধ্যে নিপাহ ভাইরাসকে সম্ভাব্য মহামারি সৃষ্টিকারী ভাইরাসের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। যদিও এটি করোনা ভাইরাসের মতো দ্রুত ছড়ায় না, তবে একবার ছড়ালে এর পরিণতি অনেক বেশি মারাত্মক। সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো-এই ভাইরাসের কোনো কার্যকর ওষুধ বা ভ্যাকসিন এখনো নেই। অর্থাৎ, চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই এখানে একমাত্র বাস্তবসম্মত কৌশল।
এই বাস্তবতায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সংক্রমণ বাংলাদেশের জন্য সরাসরি সতর্কবার্তা। বাংলাদেশে মানুষে মানুষে নিপাহ সংক্রমণের নজির ইতিমধ্যে রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। সীমান্তবর্তী যোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ও জনঘনত্ব বিবেচনায় নিলে সামান্য অবহেলাও বড় বিপর্যয়ের পথ তৈরি করতে পারে। আর তাই নিপাহ এখন জাতীয় জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন।
এমতাবস্থায় ব্যক্তি পর্যায়ে কাঁচা খেজুরের রস ও ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস পরিহার, বাদুড়ের আধখাওয়া ফল এড়িয়ে যাওয়া, ফলমূল ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে খাওয়া এবং অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা জরুরি। পাশাপাশি সামাজিকভাবে প্রয়োজন সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ। আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দরকার আরো শক্ত নজরদারি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রুত আইসোলেশন, রোগীর সেবায় নিয়োজিতদের জন্য N95 মাস্ক, গ্লাভস ও PPE কিট ব্যবহার নিশ্চিত করা। সীমান্ত ও বিমানবন্দরে কার্যকর স্বাস্থ্য স্ক্রিনিংয়ের পাশাপাশি পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেও বন্যপ্রাণী থেকে সংক্রমণ রোধে নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।







