৪৮ দেশের মহারণ: ফুটবলের বিশ্বায়ন নাকি জৌলুস হারানোর শঙ্কা?

ফুটবল বিশ্বকাপের ঢাকে কাঠি পড়ে গিয়েছে। তবে এবারের উন্মাদনার খতিয়ানটা একটু অন্যরকম, কারণ ফুটবলবিশ্ব সাক্ষী হতে চলেছে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের। এই প্রথমবার ফুটবলের বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দেশ। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ২০১৬ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিশ্বকাপকে কেবল একটি প্রতিযোগিতার গণ্ডিতে আটকে না রেখে একে একটি সামাজিক উৎসবে রূপ দেওয়ার যে পরিকল্পনা করেছিলেন, তা এবার বাস্তবায়িত হতে চলেছে। ফিফার লক্ষ্য খুব স্পষ্ট, বিশ্বজুড়ে ফুটবলের জনপ্রিয়তা আরও বাড়ানো এবং অনুন্নত বা ছোট দেশগুলোকে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ করে দেওয়া। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের ডামাডোলের মাঝেই একটা বড় প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে ক্রীড়ামোদীদের মনে, ফিফার এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ফুটবলের স্বার্থে কাজে আসবে, নাকি পুরো বিষয়টি ব্যুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে?

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিশ্বকাপের রূপান্তর কিন্তু নতুন নয়। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত মাত্র ১৬টি দেশ নিয়ে আয়োজিত হতো এই টুর্নামেন্ট, যার সিংহভাগ জুড়েই থাকত ইউরোপের দাপট। এরপর ১৯৮২ সালে দলের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৪ এবং ১৯৯৮ সালে তা ৩২ করা হয়। তবে এত পরিবর্তনের পরেও আফ্রিকা বা এশিয়ার দেশগুলোর অংশগ্রহণ ছিল নামমাত্র। এবারের সমীকরণ অবশ্য সম্পূর্ণ আলাদা। ইউরোপ থেকে মাত্র তিনটি দল বাড়লেও আফ্রিকা থেকে এবার খেলবে ১০টি দেশ, এশিয়া থেকে ৯টি এবং দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকা থেকে ৬টি করে দেশ অংশ নিচ্ছে। ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্টের প্রধান আর্সেন ওয়েঙ্গার একে স্বাভাবিক বিবর্তন হিসেবেই দেখছেন। তাঁর মতে, ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের ২৫ শতাংশ যদি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়, তবেই বিশ্বজুড়ে ফুটবলকে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন সার্থক হবে। এই নতুন নিয়মের হাত ধরেই এবার বিশ্বমঞ্চে অভিষেক হতে চলেছে কুরাসাও, কেপ ভার্দে, জর্ডন কিংবা উজবেকিস্তানের মতো ছোট ও উদীয়মান দেশগুলির।

তবে এই নতুন নিয়মে যেমন ছোট দেশগুলোর স্বপ্নপূরণ হচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে বড় দলগুলোর জন্য বিপদ অনেকটাই কমে গিয়েছে। নতুন সূচি অনুযায়ী, ১২টি গ্রুপের শীর্ষ দু’টি দল এবং সেরা আটটি তৃতীয় স্থানাধিকারী দল নকআউট পর্বে যাওয়ার টিকিট পাবে। অর্থাৎ, গ্রুপ পর্বের ৩৬টি দলের মধ্যে মাত্র ১৬টি দল বিদায় নেবে। গত বিশ্বকাপে যেখানে জার্মানির মতো চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল বা আর্জেন্টিনাকে প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হেরে চরম চাপে পড়তে হয়েছিল, এবার কিন্তু প্রথম রাউন্ডে বড় দলগুলির ছিটকে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।

এই আপাত স্বস্তির আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে একটি বড় খটকা। ফুটবল বোদ্ধাদের একাংশ মনে করছেন, বড় দলগুলোর এই সুরক্ষাকবচ বিশ্বকাপের চিরপরিচিত উত্তেজনাকে অনেকটাই জলছাপ করে দিতে পারে। আগে যেখানে প্রথম ম্যাচ থেকেই প্রতিটি দল মরণ-বাঁচন লড়াইয়ে নামত, সেখানে এবার গ্রুপ পর্বে অনেক ম্যাচই হয়তো কেবল আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেবে। জার্মানি বনাম কুরাসাও কিংবা স্পেন বনাম কেপ ভার্দের মতো অসম শক্তির লড়াই খাতার কলমে কতটা জৌলুস ছড়াবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

ক্রীড়া বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩২ দেশের বিশ্বকাপই ছিল আদর্শ ও জমজমাট। এবারের দীর্ঘায়িত প্রতিযোগিতায় গ্রুপ পর্বে মাত্র একটি ম্যাচ জিতলেই যেখানে নকআউটের দরজা খুলে যেতে পারে, সেখানে দর্শকদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটা অস্বাভাবিক নয়। বিশ্বকাপ মানেই যেখানে বিশ্বের সেরা শক্তির সেরা লড়াই, সেখানে যদি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হারিয়ে যায়, তবে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ কমতে বাধ্য। আর তেমনটা হলে, বিশ্বায়নের এই মহা-পরিকল্পনা ফিফার জন্য উল্টো ফলও এনে দিতে পারে।

বিডি প্রতিদিন/এনএইচ

Scroll to Top