আমদানি ও সরবরাহ কমায় পেঁয়াজের দাম আবার চড়ছে

দেশের পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম আবার ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি কমে যাওয়ায় এবং সরবরাহ সংকটের কারণপ্রভাব পড়েছে পেঁয়াজের দামে। এক সপ্তাহ আগেও পাইকারিতে মসলা পণ্যটি ৮৭ থেকে ৯০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। কেজিতে এখন ১১ থেকে ১৩ টাকা বেড়েছে।

নভেম্বরের শুরুতে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ছিল ১১৫ টাকা। পরে দাম কমতে শুরু করে। এক পর্যায়ে তা কেজিতে ১০০ টাকার নিচে নেমে আসে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এলসি (ঋণপত্র) খোলার সময় ডলারের দাম বাড়তি থাকায় আমদানিকারকরা এটি কম খুলছেন। এতে দেশের স্থলবন্দর দিয়ে পণ্যটি কম আসছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে বাজারে।

গতকাল মঙ্গলবার দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের আড়ত ঘুরে দেখা যায়, ভারত থেকে আমদানি করা ছোট জাতের পেঁয়াজের কেজি ৯৮ থেকে ১০৩ টাকা। আর নৌপথে আসা চীনা (বড় জাত) পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়।

অথচ এক সপ্তাহ আগেও ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যটি পাইকারিতে ৮৫ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি করেছেন ব্যবসায়ীরা। কেজিতে বেড়েছে ১১ থেকে ১৩ টাকা। খাতুনগঞ্জের আড়তে চীনা ও ভারতের পেঁয়াজ ছাড়া আর কোনো দেশের পণ্য নেই।

সেখানে দেশি পেঁয়াজের দেখা মেলেনি। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারগুলোতে আমদানি করা পেঁয়াজের ৯০ শতাংশ আসে ভারত থেকে। এ ছাড়া মিয়ানমারের কিছু পেঁয়াজ আসছিল। এখন চীনা ও ভারতীয় ছাড়া বাজারে আর কোনো দেশের পেঁয়াজ নেই।

খাতুনগঞ্জে মায়ের দোয়া ট্রেডার্সের মালিক রনি বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের স্থলবন্দর দিয়ে এখন পেঁয়াজবাহী ট্রাক আসা আগের তুলনায় কমে গেছে। আড়তে আগে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০টি ট্রাক এলেও এখন ৫ থেকে ১০টি ট্রাক আসছে। সরবরাহ সংকটের কারণে দাম বাড়ছে।’

খাতুনগঞ্জের অর্জুন স্টোরের মালিক অর্জুন চন্দ্র বণিক বলেন, ‘ভারত ছাড়া ৯টি দেশ থেকে সরকার সমুদ্রপথে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিলেও চীন ও পাকিস্তান ছাড়া বাকি সাতটি দেশ থেকে পণ্যটি আমদানি হয়েছে খুব কম।’

চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক আমদানিকারক ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করছেন না। এ ছাড়া এলসি খোলার সময় ডলারের দামও বাড়তি ছিল। মূলত দুই কারণে পণ্যটি আমদানি হচ্ছে না। এখন পাইকারিতে সংকট রয়েছে।’

ঢাকার খুচরা বাজারে সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দেশি পেঁয়াজ এখন খুচরায় ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা কেজি ও আমদানি করা পেঁয়াজ ১১৫ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজার, শ্যামবাজার, বাড্ডা ও জোয়ারসাহারা বাজার ঘুরে এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। নতুন করে দাম বাড়ার পেছনে চাহিদার তুলনায় বাজারে সরবরাহ সংকটের অজুহাত দিচ্ছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা।

আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বাজারে নতুন পেঁয়াজ আসবে। এ কারণে আমদানিকারকরা পেঁয়াজ আমদানির ঝুঁকি নিচ্ছেন না। এতে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ সংকট দেখা দেওয়ায় দাম বেড়েছে। নতুন পেঁয়াজ এলে বাজার স্থিতিশীল হবে বলে তাঁরা জানান।

জানতে চাইলে পেঁয়াজ আমদানিকারক ও শ্যামবাজার পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল মাজেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে বাজারে ব্যাপক হারে নতুন পেঁয়াজ চলে আসবে। এ কারণে আমদানিকারকরা পেঁয়াজ আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। এখন আমদানি করে কেউ ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না। কারণ নতুন পেঁয়াজ বাজারে চলে এলে দাম কেজি ৬০ টাকায় চলে আসবে।’

তিনি বলেন, ‘আজ (গতকাল) আমদানীকৃত ভারতের পেঁয়াজ পাইকারিতে ১০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। এখন পাইকারি বাজারে দেশি পেঁয়াজ নেই।’

জানতে চাইলে হিলি স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি গ্রুপের সভাপতি হারুন অর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মূলত দুটি কারণে বাজারে পেঁয়াজসংকট চলছে। একদিকে ব্যাংকগুলো আমদানিকারকদের চাহিদামতো এলসি দিচ্ছে না, এতে আমদানিকারকরাও চাহিদা মোতাবেক পেঁয়াজ আনতে পারছেন না। অন্যদিকে কয়েক দিন পরই দেশের বাজারে আগাম নতুন পেঁয়াজ চলে আসবে, তখন আমদানি পেঁয়াজের চাহিদা কমে যাবে। মূলত এসব কারণেই আমদানি কমেছে।’

গত ১৯ আগস্ট ভারত সরকার রপ্তানি শুল্ক ৪০ শতাংশ আরোপ করার পর ৪০ থেকে ৪৫ টাকার পেঁয়াজ বেড়ে হয় ৬০ টাকা। আর খুচরা বিক্রি হচ্ছিল ৭৫ থেকে ৮০ টাকায়। তখন সরকার ভারতের বিকল্প হিসেবে দেশের সমুদ্রবন্দর দিয়ে চীন, মিসর, পাকিস্তান, কাতার, তুরস্ক, নেদারল্যান্ডস, আরব আমিরাত ও মিয়ানমার থেকে ২১ হাজার ৫৮০ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমোদন দেয়। এরপর সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে পেঁয়াজের দাম কমে ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। পাকিস্তানি পেঁয়াজের দাম ছিল ৩৮ থেকে ৪০ টাকা। খুচরায় ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি করেন ব্যবসায়ীরা।

গত অক্টোবরে একই পেঁয়াজ পাইকারিতে বিক্রি হয়েছিল ৬০ টাকা। এরপর হরতাল-অবরোধের কারণে দেশে মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রভাব পড়ে খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে। ধীরে ধীরে পেঁয়াজের দাম বাড়তে থাকে। নভেম্বরের শুরুতে ভারতীয় পেঁয়াজের কেজি ছিল সর্বোচ্চ ১১৫ টাকা। কিন্তু এর এক সপ্তাহ পর ক্রেতাসংকটে পণ্যটির কেজি নেমে আসে ৮০ টাকায়। ডিসেম্বরে পণ্যটির সংকট শুরু হয়েছে।

দেশে হরতাল-অবরোধের পর থেকে দিনাজপুরের হিলি, সাতক্ষীরার ভোমরা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ দিয়ে ভারতীয় পেঁয়াজবাহী ট্রাক প্রবেশ করছে কম। স্বাভাবিক সময়ে ১৩ টনের অন্তত ১৩০টির বেশি পেঁয়াজবোঝাই ট্রাক খাতুনগঞ্জের আড়তে ঢুকলেও এখন তা ১৫ থেকে ২০টিতে নেমে এসেছে।

 

Scroll to Top