মা হাজেরার বর্ণাঢ্য জীবন

রোকেয়া মামুন

আল্লাহর প্রিয় বন্ধু হজরত ইবরাহিম (আ.)। শত পরীক্ষা-নির্যাতন মোকাবিলা করে ঈমানের পথে অটল-অবিচল ছিলেন জীবনভর। সেই শিশু বয়স থেকে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এখন বয়স ৮৬ বছর। প্রায় সময়ই তিনি ভাবতেন, আমি তো চলে যাব আমার প্রিয়তম বন্ধু আল্লাহর কাছে। কিন্তু এ জমিনে কে আমার উত্তরাধীকার হবে? কে এই উম্মতের কা-ারি হবে? তিনি দোয়া করলেন, ‘হে প্রভু! আমাকে একটি নেক সন্তান দান করুন।’ (সূরা সাফফাত : ১০০)। অনেক কান্নাকাটির পর আল্লাহ তায়ালা কবুল করলেন ইবরাহিম নবীর দোয়া। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাকে এক ধীরস্থির বুদ্ধিসম্পন্ন ছেলের সুসংবা দিলাম।’ (সূরা সাফফাত : ১০১)। এ ছেলে হলেন হজরত ইসমাঈল (আ.)। তবে আজ আমাদের আলোচ্য বিষয় বাবা-ছেলে কেউই না। আজ আমরা জানব ইবারাহিম (আ.) এর স্ত্রী এবং ইসমাঈল (আ.) এর মা মহীয়সী হজরত হাজেরা (আ.) সম্পর্কে।

মা হাজেরা ছিলেন ইবরাহিম (আ.) এর দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী ছিলেন হজরত সারা (আ.)। এ সারার দাসী ছিলেন হাজেরা। একটু পেছন থেকে বললে বুঝতে সুবিধা হবে।

জুলাইন ও তার স্ত্রীর একমাত্র মেয়ে হাজেরা। জুলাইন চাইত তাদের একটি ছেলে সন্তান হোক। কিন্তু ১০ বছর হলো হাজেরা ছাড়া তাদের কোলে আর কোনো চাঁদ আসেনি। তাই তিনি ঠিক করলেন, তিনা শহরের বিখ্যাত মসজিদে গিয়ে ছেলে সন্তান লাভের দোয়া করবেন। যেই ভাবা সেই কাজ। ১০ বছরের ছোট্ট হাজেরাকে নিয়ে রওনা হলেন তিনা শহরে। তিনা শহর থেকে ফেরার পথে জুলাইন পরিবার ডাকাতের পাল্লায় পড়ে। ডাকাত দল সবাইকে হত্যা করে হাজেরাকে নিয়ে গোলামদের হাটে বেঁচে দেয়। গোলামের হাট থেকে হাজেরাকে কিনে আনেন ওই দেশের বাদশাহ। বাদশাহ হাজেরার প্রতি মুগ্ধ হয়ে তাকে নিজের মেয়ে করে নেন। কিছুদিন পর বাদশাহর মেয়ে হলে তিনি মেয়ের লালন-পালনের ভার হাজেরার ওপর দেন। এভাবেই হাজেরা হয়ে যায় বাদশাহর মেয়ের দাসী। এ বাদশাহর মেয়েই ইবরাহিম নবীর প্রথম স্ত্রী হজরত সারা (আ.)। আরেক বর্ণনা থেকে জানা যায়, হাজেরা ছিলেন তৎকালীন মিসরের বাদশাহর মেয়ে। মিসরের বাদশাহ হজরত সারা (আ.) এর অলৌকিকতা এবং হজরত ইবরাহিম (আ.) এর মোজেজা দেখে ঈমান আনেন এবং নিজ মেয়ে হাজেরাকে উপহার হিসেবে সারা (আ.) কে প্রদান করেন। দুই বর্ণনার মধ্যে এটিই বেশি প্রসিদ্ধ। (মাআরেফুল কোরআন : ১১৫১)।

হজরত সারা ছিলেন বন্ধ্যা। তাই তিনি হাজেরাকে ইবরাহিম (আ.) এর সঙ্গে বিয়ে দেন, যাতে ইবরাহিম (আ.) তার নবুয়তি উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারেন। যথা সময়ে হাজেরা (আ.) গর্ভবতী হন এবং ফুটফুটে এক ছেলে সন্তান প্রসব করেন। কয়েক বছর পর আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ এলো শিশু ইসমাঈল এবং তার মাকে নির্জন কোথাও রেখে আসা হোক। এটা ছিল বড় ধরনের পরীক্ষা। এ পরীক্ষায়ও ইবরাহিম নবী সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। তিনি স্ত্রী-ছেলেকে নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে সফরে বের হন। সঙ্গে ছিল সামান্য খাবার ও পানীয়। চলতে চলতে এক নির্জন জনমানবহীন মরুভূমিতে এসে থামেন। তিনি স্ত্রী-ছেলেকে এখানে রেখে চলে আসতে চাইলে মা হাজেরা বলেন, ‘আল্লাহর নবী! এ জনমানবহীন মরু অঞ্চলে এক অবলা নারী ও তার দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে রেখে যাচ্ছেন, এটা কি আল্লাহর ইচ্ছায়? ইবরাহিম নবী মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন, হ্যাঁ! এটা পরওয়ারদিগারের ইচ্ছায়ই হচ্ছে।

হাজেরা (আ.) এর মলিন মুখে হাসি ফটে ওঠল। তিনি বললেন, ‘যদি আল্লাহর ইচ্ছায় হয়ে থাকে তবে তো কোনো ভয় নেই। তিনিই আমাদের দেখভাল করবেন। আপনি নিশ্চিন্তায় বাড়ি ফিরে যান।’

ইবরাহিম (আ.) বাড়ির উদ্দেশে রওনা করলেন। একটু দূর এসে তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার পরিবারের ক’জন সদস্যকে তোমার সম্মানীত ঘরের পাশে এক অনুর্বর উপত্যকায় পুনর্বাসিত করলাম, যাতে তারা সালাত কায়েম করতে পারে। অতএব তুমি কিছু মানুষের মনে তাদের প্রতি ভালোবাসা জন্মে দিও। ফলফলাদি ও জীবনোপকরণের সুন্দর ব্যবস্থা করে দিও। আশা করা যায়, ওরা শোকরগুজার করবে।’ (সূরা ইবরাহিম : ৩৭)।

ইবরাহিম (আ.) চলে এলেন। হাজেরা ও শিশু ইসমাঈল নির্জন মরুভূমিতে দিন কাটাতে লাগলেন। সামান্য খাবারও শেষ হয়ে গেল। ক্ষুধা তৃষ্ণায় মা-ছেলে ছটফট করতে লাগলেন। মা হাজেরা রয়েসয়ে থাকলেন। কিন্তু শিশু ইসমাঈল তো আর পারছে না। অল্প পরেই প্রাণবায়ু বের হয়ে যাবে। শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করে পৃথিবী থেকে, চিরবিদায় নেবে সন্তান। এমন পরিস্থিতিতে কোনো মা-ই বসে থাকতে পারেন না। পারেননি এ মহীয়সীও। একবার সাফা পাহাড়ে ওঠেন তো আবার মারওয়া পাহাড়ে দৌড় দেন। কোথাও যদি পানির চিহ্নটুকুও দেখা যায়। একবার, দুইবার, তিনবার করে মোট সাতবার এভাবে পাহাড় থেকে পাহাড়ে দৌড়ে তিনি হতাশ হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। তাকানো মাত্রই তিনি দেখতে পেলেন, শিশু ইসমাঈলের পায়ের নিচ থেকে সুমিষ্ট পানি উতরে উঠছে। তিনি দৌড়ে এলেন। চারিদেকে বাঁধ দিয়ে পানি আটকালেন। বুঝতে বাকি রইল না, এ আল্লাহর গায়েবি সাহায্য। মা-ছেলে প্রাণভরে পানি পান করলেন। হাজীরা যে সাফা-মারওয়া প্রদক্ষিণ করেন, এটা মূলত মা হাজেরার ওই স্মৃতিকে স্মরণ করেই করে থাকেন। (তাফসিরে মাজহারি : ৬/৪২০)।

পানির অস্তিত্ব মানে, প্রাণের অস্তিত্ব। বিভিন্ন কাফেলার লোকরা এখানে পানি পানের জন্য বিরতি দেয়। কেউ আবার স্থায়ীভাবে বসবাসও শুরু করে। এভাবেই অনাবাদি মরুভূমি আবাদ হয়ে যায়। কয়েক বছর পর আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইসমাঈলকে কোরবানি করার জন্য ইবরাহিম (আ.) কে সঙ্গে করে নিয়ে যান। শয়তান হাজেরাকে ধোঁকা দেয়ার জন্য বলে, ‘তোমার আদরের সন্তানকে কিন্তু জবাই করার জন্য নিয়ে যাচ্ছে।’
হাজেরা বলল, ‘কার নির্দেশে?’
‘আল্লাহর নির্দেশে।’
‘যদি আল্লাহর নির্দেশে হয়ে থাকে তবে আমি পূর্ণ সন্তুষ্ট আছি।’
হাজেরার জবাব শুনে শয়তানের থোতামুখ ভোঁতা হয়ে যায়। সে দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে হাজেরার কাছ থেকে চলে আসে। এর কয়েক বছর পরই হাজেরা মহান মালিকের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান মোমিনদের কাক্সিক্ষত ঠিকানায়। (কাসাসুল আম্বিয়া : ২২০-২২৪)।

এ মহীয়সীর জীবন থেকে নারীর জন্য তো বটেই, পুরুষের জন্যও রয়েছে অনেক শিক্ষণীয় দিক। নারীরা যেন স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং ভক্তি বজায় রাখেন, পাশাপাশি মহান আল্লাহর সব সিদ্ধান্ত হাসিমুখে মেনে নিতে পারেন, বিপদ-মুসিবতে ভেঙে না পড়ে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সামনে পথ চলেনÑ এসবই শিক্ষা দেয় মা হাজেরার বর্ণাঢ্য জীবন।

আজকের নারী সমাজ যদি এ শিক্ষাগুলো তাদের জীবনে ধারণ করতে পারেন তবে পারিবারিক, সামাজিক অনেক কঠিন সমস্যার সমাধান হবে অতি দ্রুত, খুব সহজে।

বাংলাদেশ সময়: ১২১০ ঘণ্টা, ২৪ আগস্ট ২০১৭, লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এস