কবে আসবে বাংলাদেশের ফুটবলে আবার সেই সোনালী দিন?

ছবিঃ সংগৃহীত

ক্রিকেটের তখন এত জয়জয়কার হয়নি বাংলাদেশে। স্বাধীন বাংলার মানুষ খেলাধুলা বলতেই বুঝতো ফুটবল। গ্রাম থেকে শহর, রোদ হোক বা বৃষ্টি, অবসরে ফুটবল ছিল মানুষের একমাত্র বিনোদন। পাড়া-মহল্লায় আয়োজিত হতো ফুটবল টুর্নামেন্ট। সেই টুর্নামেন্টকে ঘিরে হাতাহাতি- মারামারির মতো ঘটনা যে ঘটত না তা নয়, কিন্তু পুনরায় মানুষে মানুষে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করতো ফুটবল।

বাংলাদেশের ফুটবলে তখন আবাহনী-মোহামেডান দু’পক্ষ। দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবের খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে ভিড় জমাতো হাজার হাজার দর্শক। স্টেডিয়াম ভরে যেত সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের সমর্থনে। তখন মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ডিফেন্ডার মোনেম মুন্নার মতো ফুটবলার। কাজী সালাউদ্দিন, নওশের, অমলেশ সেন, বাদল রায়, মনোয়ার হোসেন নান্নু, আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু, ওয়াসিম ইকবাল, আশিষ ভদ্র, সালাম মুর্শিদির মতো ফুটবলাররা দাপট দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন ক্লাব ও জাতীয় দলের জার্সিতে।

বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা নিয়ে একটা গল্প প্রচলিত আছে। গল্পটা এমন- এক ফুটবলপাগল ভক্ত প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসে প্রিয় দলের খেলা আছে জেনে অনেক কষ্টে একটি টিকেট জোগাড় করে ঢুকে পড়লেন গ্যালারিতে। কিন্তু তিনি জানতেন না, যে গ্যালারিতে বসেছেন সেটি ছিল বিপক্ষ দলের সমর্থকে পরিপূর্ণ। খেলা শুরু হওয়ার পর মুগ্ধ হয়ে দেখছেন প্রিয় দলের এগিয়ে চলা। এর মধ্যেই তার পছন্দের দল গোল করে বসল। প্রিয় দলের গোলে সমর্থকটিও উল্লাসে চিৎকার করে উঠলেন। ব্যস! শুরু হয়ে গেল ধুন্ধুমার কাণ্ড। সে সময়ে ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের পাগলামির ধরনটা ছিল এমনই। আর হবেই না কেন? সে সময় বাংলাদেশের ফুটবলে সালাউদ্দিন, চুন্নু, বাদল রায়, সাব্বির, কায়সার, কানন, ওয়াসিম, রুমি, আসলাম, মহসিনের মতো অসাধারণ সব ফুটবল প্রতিভার জন্ম হয়েছিল। বাংলাদেশের অনেক খেলোয়াড় একসময় কলকাতাসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ক্লাব ফুটবলে নিয়মিত খেলতেন।

ওগুলো বাংলাদেশের ফুটবলের ‘সোনালি সময়’-এর গল্প। সত্তর কিংবা আশির দশকে যখন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে আবাহনী-ফরাশগঞ্জ ম্যাচের টিকিট নিয়েও ‘হাতাহাতি’ হয়েছে, সেই সময়ের। ‘গোলাভরা ধান, আর গোয়ালভরা গরুর মতো আমাদের ঢাকাই ফুটবলের দর্শকদেরও এখন ঠাঁই হয় ওই ইতিহাসের পাতায়ই। যেন ‘অতীত’। কেউ বলেন, মাঠে দর্শক নেই বলেই খেলোয়াড়দের খেলা ওঠে না। কারও মতে, খেলা ভালো হয় না বলেই মাঠে দর্শক নেই।

২০১৬ সালে ভুটানের কাছে হারের পর ফুটবলপ্রেমীরা সমালোচনায় এফোর-ওফোর করেছিলেন ফুটবলারদের। বলেছিলেন, বাংলাদেশের ফুটবলের কফিনে শেষ পেরেক ঠুঁকে দিয়েছে পর্বতবেষ্টিত দেশ ভুটান। কিন্তু হাল ছাড়েনি বাফুফে। একের পর এক নিয়োগ দিয়েছে দেশি ও বিদেশি কোচ। তারই ধারাবাহিকতায় গত বছর নিয়োগ পান জেমি ডে। তার নিয়োগে সরব হয়েছিলেন নিন্দুকেরা। কিন্তু সমালোচনা গায়ে মাখেননি তিনি। বরং নিজস্ব মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে দল সাজান একঝাঁক তরুণ প্রতিভাবান ফুটবলার নিয়ে। দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, লাওসের বিপক্ষে প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে গুছিয়ে নেন দল। ফুটবলারদের বছরব্যাপী মাঠে রাখার ফল পাচ্ছেন এখন। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অসাধারণ খেলছেন জামালরা। সমানে সমানে লড়াই করছে র‌্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা আফগানিস্তান, কাতার ও ভারতের বিপক্ষে। বিশেষ করে কাতার ও ভারতের বিপক্ষে জয় না পাওয়াটা ছিল দুর্ভাগ্যজনক।

এমন নজরকাড়া পারফরম্যান্সে জেগে উঠেছে দেশের ফুটবল। ক্রিকেট সমর্থনপুষ্ট দেশটিতে ফুটবলকে ফের দর্শকের মনের কোঠরে নিয়ে যেতে চান কোচ। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত পত্রিকার দ্য গার্ডিয়ানে বেঙ্গল টাইগার্সদের কোচ জেমি বলেছেন তার স্বপ্নের কথা, ‘দেশটিতে ক্রিকেটই মূল খেলা। এখানকার লোকেরা ক্রিকেট ভালোবাসেন। কিন্তু আমি মনে করি ফুটবলের সুযোগ আছে ক্রিকেটকে পেছনে ফেলার।’ জামালদের কোচ আরও বলেন, ‘অবশ্য এটাও সত্যি, বাংলাদেশের জনগণ ফুটবল ভালোবাসে। যদিও সাফল্য নেই সেখানে। টি-২০ ম্যাচে দেখেছি ২০-৩০ হাজার লোক খেলা দেখেন। ফুটবলেও ৩০-৪০ হাজার লোক খেলা দেখেন।’