মৌসুম শুরুর আগেই ঋণের বোঝায় জর্জরিত রোনালদোর ক্লাব

সৌদি প্রো লিগ মৌসুম শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ক্লাব আল-নাসর বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে। ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়ায় ক্লাবটি তাদের সব ধরনের খেলোয়াড় দলবদল বা ট্রান্সফার কার্যক্রম স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।

আগামী ১৩ আগস্ট সৌদি প্রো লিগ শুরু হতে যাচ্ছে, কিন্তু শীর্ষস্থানীয় ক্লাবগুলোর মধ্যে আল-নাসর এখনো তাদের দল শক্তিশালী করার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ক্লাবটির ঋণের পরিমাণ ৮০০ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল (২১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ছাড়িয়ে গেছে।

সৌদি আরবের শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া দৈনিক ‘আল-রিয়াদিয়াহ’-এর তথ্যমতে, এই আর্থিক চাপের কারণে আল-নাসর নতুন খেলোয়াড়দের নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করাতে পারছে না; বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত তাদের গ্রীষ্মকালীন দলবদলের পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত হয়ে আছে।

এই পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যেই ক্লাবের খেলোয়াড় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পড়েছে। পর্তুগিজ মিডফিল্ডার সামু কস্তাকে দলে ভেড়ানোর বিষয়ে রিয়াল মায়োর্কার সঙ্গে সমঝোতা হওয়া সত্ত্বেও, সেই দলবদল প্রক্রিয়াটি এখনো সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

ক্লাবের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে উইঙ্গার আব্দুল রহমান ঘারিবের চুক্তি নবায়নের আলোচনাও থমকে গেছে। নতুন মৌসুম শুরু হতে তিন সপ্তাহেরও কম সময় বাকি থাকতে এই বিলম্ব আল-নাসরের প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত মৌসুমে বড় কোনো ঘরোয়া শিরোপা জিততে ব্যর্থ হওয়ার পর এবার তারা আবারও শিরোপা জয়ের লড়াইয়ে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্লাবের আর্থিক অবস্থা স্থিতিশীল করতে এর সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিক ‘সৌদি পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড’ (পিআইএফ) একটি ত্রিমুখী কৌশল গ্রহণ করেছে। এই পরিকল্পনার আওতায়, বাড়তি অর্থের সংস্থান না হওয়া পর্যন্ত আল-নাসরের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পর্ষদের অর্থ ব্যয়ের ক্ষমতা সীমিত থাকবে।

ক্লাবটিকে আরও টেকসই আর্থিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর লক্ষ্যে পিআইএফ আর্থিক, বাণিজ্যিক ও আইনি উপদেষ্টাও নিয়োগ দিয়েছে; যাদের কাজ হবে আয়ের উৎস বাড়ানো, বাণিজ্যিক কার্যক্রম জোরদার করা এবং পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আনা। জানা গেছে, এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ধাপে বাইরের বিনিয়োগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

‘আল-রিয়াদিয়াহ’ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-নাসরের মালিকানার একাংশ কিনতে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ইতোমধ্যে দুটি জোরালো প্রস্তাব পাওয়া গেছে। তবে পিআইএফ ক্লাবের ওপর নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে আংশিক মালিকানা বিক্রির বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ কৌশলের অংশ হিসেবে দেশটির চারটি বড় ফুটবল ক্লাবের মালিকানা নতুন করপোরেট কাঠামোর অধীনে হস্তান্তরের পর ২০২৩ সাল থেকে আল-নাসরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা পিআইএফ-এর হাতে রয়েছে।

বর্তমানে আল-নাসরের ৭৫ শতাংশ মালিকানা এই সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের( পিআইএফ) হাতে রয়েছে এবং বাকি ২৫ শতাংশ ক্লাবের অলাভজনক ফাউন্ডেশনের মালিকানায় আছে। রোনালদো, করিম বেনজেমা এবং নেইমারের মতো বিশ্বখ্যাত তারকাদের দলে ভেড়ানোর জন্য অর্থায়ন করে সৌদি ফুটবলের আমূল পরিবর্তনে পিআইএফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, তাদের বিনিয়োগের ধরনটি ধীরে ধীরে অধিকতর বাণিজ্যিক টেকসই কাঠামোর দিকে সরে আসছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে পিআইএফ আল-হিলালের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা প্রিন্স আল-ওয়ালিদ বিন তালাল আল-সৌদের মালিকানাধীন ‘কিংডম হোল্ডিং কোম্পানি’-র কাছে বিক্রির বিষয়ে সম্মত হয়। এই পদক্ষেপটিকে সৌদি ফুটবলে বেসরকারি খাতের বৃহত্তর অংশগ্রহণের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সর্বশেষ প্রতিবেদনগুলো যদি সঠিক বলে প্রমাণিত হয়, তবে আল-নাসরও সেই একই পথে হাঁটতে পারে।

আর্থিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও, ক্লাবে রোনালদোর অবস্থানে কোনো ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে না। পর্তুগিজ অধিনায়ক চুক্তির মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সাল পর্যন্ত আল-নাসরে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সে সময়কার বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এই চুক্তির অংশ হিসেবে তিনি ক্লাবের আংশিক মালিকানাও লাভ করেছিলেন।

পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই তারকা এখনো ক্লাবের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক আকর্ষণ। আল-নাসর যখন নতুন বিনিয়োগ ও ঘরোয়া ফুটবলে সাফল্যের ধারায় ফেরার চেষ্টা করছে, তখন তিনি এতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

আল-নাসরের আর্থিক সংকট সৌদি ক্রীড়াঙ্গনের সামগ্রিক পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। সৌদি আরব তার দীর্ঘমেয়াদী ক্রীড়া-লক্ষ্যের পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে ফুটবল ও অন্যান্য বড় ক্রীড়া প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে; একইসঙ্গে ক্লাবগুলোকে তাদের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় তহবিলের ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য ক্রমশ উৎসাহিত করা হচ্ছে।

Scroll to Top